বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) অন্যান্য ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি এগিয়ে গেলেও সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি নিয়ে জটিলতা চলছে। এর ফলে ৩৭তম বিসিএসের অনেক কর্মকর্তা এখনো নবম গ্রেডের প্রভাষক পদে কর্মরত রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একই বিসিএস ব্যাচে নিয়োগ পাওয়া অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি পেলেও শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের একটি অংশ পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে পদমর্যাদা, আর্থিক সুবিধা ও পেশাগত অগ্রগতিতে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
পদসংকটে আটকে প্রথম পদোন্নতি
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে প্রভাষক পর্যায়ে অনুমোদিত পদ রয়েছে ৯ হাজার ৭৮২টি। বিপরীতে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে অনুমোদিত পদ রয়েছে ৪ হাজার ৪৫১টি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক পদের মধ্যে বড় ধরনের সংখ্যাগত ব্যবধান থাকায় যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় চাকরিকাল পূরণ করেও অনেক কর্মকর্তা সময়মতো পদোন্নতি পাচ্ছেন না। নিয়মিত পদ সৃষ্টি, পদ আপগ্রেডেশন এবং বিকল্প প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকায় সংকটটি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে বলে তাদের দাবি।
ডিপিসি শেষ হলেও জিও হয়নি
পদোন্নতি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে ২০২৬ সালের ১৬, ১৭ ও ২১ সেপ্টেম্বর ৩৭তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের নিয়ে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়।
তবে ডিপিসির কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরও পদোন্নতির সরকারি আদেশ বা জিও জারি না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের দাবি, ডিপিসির সুপারিশ অনুযায়ী যোগ্য কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতির আদেশ জারি করতে হবে। একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও প্রচলিত বিধিমালা অনুসরণ করে পদোন্নতির সঙ্গে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধাও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
২ হাজার ৮২৩ অতিরিক্ত পদ সৃষ্টির প্রস্তাব
শিক্ষা ক্যাডারের পদস্বল্পতা কমাতে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে ২ হাজার ৮২৩টি সুপারনিউমারারি বা অতিরিক্ত পদ সৃষ্টির প্রস্তাবের কথাও সামনে এসেছে।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করা হলে নিয়মিত অনুমোদিত পদ না থাকলেও নির্ধারিত বিধি ও শর্ত পূরণকারী কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জট কমানোর পাশাপাশি কর্মকর্তাদের পেশাগত অগ্রগতিও সহজ হতে পারে।
তবে প্রস্তাবটির চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো জানা যায়নি।
অন্যান্য ক্যাডারের সঙ্গে বৈষম্যের অভিযোগ
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একই বিসিএস ব্যাচে নিয়োগ পাওয়া অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি পেলেও শিক্ষা ক্যাডারে অনেককে দীর্ঘ সময় একই পদে থাকতে হচ্ছে।
তাদের মতে, এর ফলে বেতন-ভাতা, পদমর্যাদা, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ পেশাগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় এ ব্যবধান আরও দৃশ্যমান হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
পদোন্নতির দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি
পদোন্নতির সরকারি আদেশ জারিসহ দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের দাবিতে ২৫ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রাঙ্গণে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন ৩৬তম, ৩৭তম ও ৩৮তম বিসিএসের পদোন্নতিবঞ্চিত শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
কর্মসূচি থেকে ৩৭তম বিসিএসসহ যোগ্য কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতির জিও জারি, প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত এবং পদস্বল্পতা দূর করতে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির দাবি জানানো হয়।
স্থায়ী সমাধানের দাবি
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি-সংকট কোনো একটি ব্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ও প্রশাসনিক সমস্যার ফল।
উচ্চতর পদে পর্যাপ্ত অনুমোদিত পদ না থাকা, নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ সীমিত হওয়া এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাদের।
তাদের প্রত্যাশা, ৩৭তম বিসিএসের যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জিও দ্রুত জারি, সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত এবং নিয়মিত পদোন্নতির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এ সংকটের স্থায়ী সমাধান করা হবে।


