বাংলাদেশে আয়কর আইন, ২০২৩ এবং পরবর্তী সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, অনেক করদাতার ক্ষেত্রে Taxpayer Identification Number (TIN) থাকলে নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। তাই ‘আয় নেই, রিটার্নও দিতে হবে না’—এমন ধারণা করদাতার জন্য ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে কর প্রশাসনের কার্যক্রম ক্রমেই ডিজিটাল ও তথ্যনির্ভর হচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিনিময় ও যাচাই ব্যবস্থার ফলে করদাতার তথ্যের অসঙ্গতি বা রিটার্ন না দেওয়ার বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়ছে।
রিটার্ন না দিলে যেসব সমস্যায় পড়তে পারেন
জরিমানা ও অতিরিক্ত আর্থিক দায়
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে আয়কর আইন অনুযায়ী জরিমানা আরোপ হতে পারে। বিলম্বের সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত জরিমানা ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিলম্বজনিত সুদও যুক্ত হতে পারে। কয়েক বছর রিটার্ন না দিলে পরবর্তী সময়ে একাধিক বছরের জরিমানা ও সুদের কারণে আর্থিক দায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বিভিন্ন নাগরিক সেবা পেতে সমস্যা
আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা Proof of Submission of Return (PSR) অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক সেবা গ্রহণের জন্য প্রয়োজন হয়। নিয়মিত রিটার্ন দাখিল না করলে ঋণ গ্রহণ, নির্দিষ্ট সীমার বেশি সঞ্চয়পত্র কেনা, ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ বা নবায়ন, গাড়ি কিংবা নির্দিষ্ট সম্পত্তি কেনাবেচা ও নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ বা নবায়নসহ বিভিন্ন কাজে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা এলাকায় নির্দিষ্ট ধরনের জমি বা ফ্ল্যাট নিবন্ধন এবং কোনো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার বা পরিচালক হওয়ার ক্ষেত্রেও রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
নোটিশ ও কর নির্ধারণের ঝুঁকি
রিটার্ন দাখিল না করলে কর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী নোটিশ দিতে পারে এবং বকেয়া রিটার্ন দাখিলের জন্য নির্দেশ দিতে পারে। নোটিশের পরও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে বিদ্যমান তথ্যের ভিত্তিতে কর কর্তৃপক্ষ কর নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ব্যাংক লেনদেনসহ বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে আগের বছরগুলোর আয় ও কর-সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেলে করদাতার ফাইল যাচাই বা অডিটের আওতায় আসার সম্ভাবনাও থাকে।
ভুল তথ্য বা ভুয়া কাগজপত্রের ঝুঁকি
রিটার্ন দাখিলের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য, ভুয়া কাগজপত্র বা জাল প্রমাণপত্র ব্যবহার করা আরও গুরুতর আইনি সমস্যার কারণ হতে পারে। তথ্য যাচাই ও ডিজিটাল ডাটা ম্যাচিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ধরনের অসঙ্গতি শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অপরাধের ধরন ও প্রযোজ্য আইনের ধারার ওপর নির্ভর করে এ ধরনের ঘটনায় আর্থিক জরিমানা এবং অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
করযোগ্য আয় না থাকলে কী করবেন?
কারও আয় যদি নির্ধারিত করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকে, তার অর্থ এই নয় যে সব ক্ষেত্রেই TIN থাকলেই কোনো রিটার্ন দিতে হবে না। রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা ব্যক্তির আয়, TIN-এর অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানের ওপর নির্ভর করে।
তাই ‘জিরো রিটার্ন’ বা কর পরিশোধ না থাকা রিটার্নের প্রয়োজন আছে কি না, তা বর্তমান আইন ও নিজের কর পরিস্থিতি অনুযায়ী নিশ্চিত করা উচিত। প্রয়োজনে আয়কর আইন সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট কর কার্যালয়ের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
নিয়মিত রিটার্ন দাখিলের মাধ্যমে কর-সংক্রান্ত নথিপত্র হালনাগাদ রাখা ভবিষ্যতের বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে TIN থাকা ব্যক্তিদের নিজেদের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা প্রতি করবর্ষে যাচাই করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম
পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট


