বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য দেশের মাটিতে নির্মিত বাড়ি, কেনা ফ্ল্যাট কিংবা গাড়ির মতো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ থাকলে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী বৈদেশিক উপার্জন করমুক্ত হলেও দেশের মাটিতে দৃশ্যমান সম্পদের মালিক হলে রিটার্ন না দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি পূর্ববর্তী করবর্ষগুলোতে রিটার্ন জমা দেওয়া না হয়ে থাকলে, বড় ধরনের আইনি জটিলতা ও জরিমানা এড়াতে প্রবাসীদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর প্রধান দিকসমূহ
রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা (ধারা ১৬৬): দেশে মোটর গাড়ি (কার, জিপ বা মাইক্রোবাস) এবং যেকোনো সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা জেলা সদর এলাকায় বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিক হলে নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
বৈদেশিক আয়ের করছাড় (ষষ্ঠ তফসিল, অংশ ১): বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে পাঠানো বৈদেশিক আয় বা রেমিট্যান্স সম্পূর্ণ করমুক্ত। তবে এই আয়ের বিপরীতে ব্যাংকিং বিবরণী বা রেমিট্যান্স সার্টিফিকেট রিটার্নে প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক।
গৃহসম্পত্তি হতে আয় (ধারা ৩৫ ও ৩৬): দেশের বাড়ি বা ফ্ল্যাট থেকে আসা ভাড়া করযোগ্য আয় হিসেবে গণ্য হবে। তবে আবাসিক সম্পত্তির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ এবং বাণিজ্যিক সম্পত্তির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ অর্থ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাদ দিয়ে নিট করযোগ্য আয় হিসাব করতে হবে।
অগ্রিম কর সমন্বয় (ধারা ১৫৩): গাড়ির ফিটনেস বা নিবন্ধন নবায়নের সময় ইঞ্জিনের সিসি (cc) অনুযায়ী বিআরটিএ-তে যে অগ্রিম আয়কর (AIT) দেওয়া হয়, তা বার্ষিক মূল করের সাথে সমন্বয় বা ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা হিসেবে গ্রহণ করা যাবে।
ব্যর্থতায় জরিমানা (ধারা ২৬৬): নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে ২৬৬ ধারা অনুযায়ী এককালীন জরিমানা, অতিরিক্ত ফি এবং বিলম্ব সুদ গুনতে হতে পারে।
প্রবাসীদের জন্য ধাপভিত্তিক করণীয়
০১. ই-রিটার্ন পোর্টালে অনলাইন নিবন্ধন:
প্রবাসীরা এখন বিদেশে বসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ই-ট্যাক্স পোর্টালে (etaxnbr.gov.bd) ই-টিন (e-TIN) খোলার পাশাপাশি অ্যাকাউন্ট নিবন্ধন করতে পারছেন। প্রবাসীদের সুবিধার জন্য বায়োমেট্রিক সিমের জটিলতা এড়িয়ে ব্যক্তিগত ই-মেইলে ওটিপি (OTP) পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট নম্বর ও ভিসার কপি প্রয়োজন হবে।
০২. আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রস্তুতকরণ:
- বৈদেশিক আয়: ব্যাংকের স্টেটমেন্ট ও এনবিআর স্বীকৃত রেমিট্যান্স সার্টিফিকেট সংগ্রহে রাখতে হবে।
- দেশীয় আয়: বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্র, ভাড়া আদায়ের ব্যাংক হিসাব এবং পৌরকর বা ল্যান্ড ট্যাক্সের রশিদ প্রস্তুত রাখতে হবে।
- সম্পদ ও দায় (IT-10B): অর্জিত বাড়ি বা ফ্ল্যাটের দলিল অনুযায়ী মূল ক্রয়মূল্য এবং গাড়ির নিবন্ধনের তথ্য সম্পদমূল্যে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
০৩. বকেয়া রিটার্ন দাখিল ও আইনি সমাধান:
- চলতি করবর্ষ: দেশীয় আয় (যেমন: বাড়ি ভাড়া) করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে হিসাব সম্পন্ন করে অনলাইনে চলতি বছরের রিটার্ন জমা দিতে হবে।
- বিগত বছরের রিটার্ন: আগে রিটার্ন জমা দেওয়া না থাকলে অনুমোদিত আয়কর আইনজীবী বা ট্যাক্স রিটার্ন প্রিপারারের (TRP) পরামর্শ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসে বিগত বছরের রিটার্ন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।
- বিশেষ সুযোগ: প্রবাসীরা দেশে ফেরার ৯০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রমাণক পেশ করে বিলম্ব জরিমানা এড়ানোর সুযোগ পেতে পারেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমেও আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ রয়েছে।
প্রবাসী করদাতাদের কালবিলম্ব না করে দ্রুত ই-ট্যাক্স পোর্টালে নিবন্ধন সম্পন্ন করার উচিত। বাংলাদেশে যদি বাড়ি ভাড়া বা অন্য কোনো খাত থেকে করযোগ্য আয় না-ও থাকে, তবুও রেমিট্যান্সের প্রমাণপত্র, সম্পত্তির দলিল ও গাড়ির ট্যাক্স টোকেন যুক্ত করে অনলাইনে শূন্য করযোগ্য আয়ের (“Zero Taxable Income”) অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম
পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট


