একটি দেশের বিমানবন্দরকে সে দেশের আয়না বা প্রতিচ্ছবি বলা হয়। বিদেশি পর্যটক ও যাত্রীরা কোনো দেশে প্রবেশ করার পর প্রথম বিমানবন্দরটিই দেখেন। এর পরিবেশ, শৃঙ্খলা এবং সেবা দেখে তারা পুরো দেশ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পান। ইমিগ্রেশন, লাগেজ প্রাপ্তি এবং কাস্টমস পারাপারের গতি ও আধুনিকতা দেশের প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দেয়। টার্মিনালের ভেতরের ও বাইরের পরিচ্ছন্নতা এবং সুযোগ-সুবিধা সার্বিক সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটায়।
পৃথিবীর অনেক দেশের বিমানবন্দর আমি নিজে সরেজমিনে দেখেছি।লন্ডন, আমেরিকা, ইউনাইটেড কিংডম, তুরস্ক, দুবাই—উন্নত বিশ্বের কথা বাদই দিলাম। আমাদের চেয়েও অনেক কম উন্নত, এমন অনেক দেশেও বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে গেলে মানুষের সঙ্গে কী সুন্দর, কী ভদ্র এবং কী মিষ্টি ব্যবহার করা হয়!
আমি নিজে বহু দেশের ইমিগ্রেশন ফেস করেছি। একজন যাত্রীকে তারা প্রথমে একজন মানুষ এবং একজন সম্মানিত নাগরিক হিসেবেই দেখে। প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করবে, ডকুমেন্ট দেখবে, যাচাই করবে—কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটার মধ্যে একটা সৌজন্য, একটা মানবিকতা থাকে।
আর আমাদের দেশে অনেক সময় ইমিগ্রেশন বা সরকারি দপ্তরের কিছু কর্মকর্তার আচরণ দেখলে মনে হয়—“পাইছি চোর, পাইছি আসামি!”
কেন এমন হবে?
একজন বিদেশগামী মানুষ অপরাধী নন। একজন বিদেশ থেকে দেশে ফেরা মানুষও অপরাধী নন। বরং অনেক ক্ষেত্রে তিনি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা। তার পাসপোর্ট পরীক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব—কিন্তু তাকে হেয় করা, অযথা ভয় দেখানো কিংবা ক্ষমতার প্রকাশ ঘটানো কোনো দায়িত্বের অংশ হতে পারে না।
এখানেই আসলে সমস্যাটা শুধু কর্মপদ্ধতির নয়—সমস্যাটা মানসিকতায়।
শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, চীন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া—প্রায় বিশটি দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমাদের বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে তুলনা করতে গেলে সমস্যাটা শুধু অবকাঠামোগত নয়; মূল সমস্যাটা অনেক বেশি গভীরে—মানসিকতা, জবাবদিহি এবং ব্যবস্থাপনার।
আমাদের বিমানবন্দরে এমন নয় যে প্রতিদিন হাজার হাজার বিমান একসঙ্গে ল্যান্ডিং-টেকঅফ করছে। তাহলে এত সীমিত সংখ্যক ফ্লাইটের যাত্রী ও লাগেজ ব্যবস্থাপনায় কেন এত অব্যবস্থাপনা? আমার কাছে মূল প্রশ্ন হলো—যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ যাত্রীকে সেবা দেওয়া, তারা কি যাত্রীকে আদৌ “কাস্টমার” হিসেবে দেখেন? আমার অভিজ্ঞতা বলে, অনেক ক্ষেত্রেই এর উত্তর নেতিবাচক।
কাস্টমসের আচরণ
বিদেশ থেকে ফিরলেই অনেক সময় একজন যাত্রীকে এমনভাবে প্রশ্ন করা হয়, যেন সে কোনো অপরাধ করে দেশে ফিরেছে। আমার নিজের চোখের সামনে এমন ঘটনা ঘটেছে—মালয়েশিয়া থেকে ঘুরে আসা একজন তরুণকে তার ব্যাগ খুলিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে, চার দিনের জন্য গিয়ে তিনটি জিন্সের প্যান্ট কেন? তাও আবার পুরোনো প্যান্ট!
আমাকেও প্রশ্ন করা হয়েছে—কয়েকটি শ্যাম্পু, কিছু কসমেটিকস কেন এনেছি, পরিবারের জন্য কয়েকটি কাপড় কেন এনেছি? প্রশ্ন করা যাবে না—এটা বলছি না। কিন্তু প্রশ্ন করারও একটি ভদ্রতা, পেশাদারিত্ব এবং যুক্তিসংগত পদ্ধতি থাকা উচিত। একজন যাত্রীকে সম্মান দিয়ে জিজ্ঞাসা করা আর তাকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা—দুটো এক জিনিস নয়।
ইমিগ্রেশনেও একই সমস্যা
আমার পাসপোর্টে বিভিন্ন দেশের ভিসা, ভ্রমণের রেকর্ড—সবই স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। তারপরও এমন প্রশ্ন করা হয়, যার উত্তর পাসপোর্ট দেখলেই বোঝা যায়।
“এই প্রথম যাচ্ছেন?” “কেন যাচ্ছেন?” “কী করছেন?”
প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন করার ধরনটাই একজন মানুষকে সম্মানিত যাত্রী হিসেবে দেখছে, নাকি সন্দেহভাজন ব্যক্তি হিসেবে দেখছে—সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিটি যাত্রীকে চোর, অপরাধী বা সন্দেহভাজন হিসেবে দেখার মানসিকতা দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনা করা যায় না।
লাগেজ ব্যবস্থাপনা আরও বড় সমস্যা
বিমান থেকে লাগেজ নামানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা, পর্যাপ্ত জনবল, কাজের পরিমাণ অনুযায়ী লোকবল এবং প্রত্যেকের দায়িত্ব—এসব কি কার্যকরভাবে নির্ধারিত আছে?
যদি থার্ড পার্টির মাধ্যমে লাগেজ হ্যান্ডলিং করা হয়, তাহলে পরিষ্কার KPI থাকা উচিত।
একটি বিমান অবতরণ করল—ধরা যাক ১০ জন কর্মী কাজ করবে। কত মিনিটের মধ্যে লাগেজ আনলোড হবে, কত মিনিটের মধ্যে বেল্টে পৌঁছাবে—এর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে।
কাজের পরিমাণ অনুযায়ী জনবল, নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট দায়িত্ব এবং CCTV-ভিত্তিক মনিটরিং—সবকিছুই পরিমাপযোগ্য হওয়া উচিত।
কাজ হলো কি হলো না—এটা শুধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রিপোর্টের ওপর নির্ভর করবে কেন?
লাগেজ চুরি—একজন যাত্রীর জন্য কতটা কষ্টের?
একজন প্রবাসী বা বিদেশফেরত মানুষ হয়তো শখ করে পরিবারের জন্য একটি জিনিস কিনে এনেছেন। কেউ হয়তো অনেক কষ্টের টাকা দিয়ে একটি উপহার এনেছেন।
সেই লাগেজ যদি হারিয়ে যায়, তালা ভেঙে জিনিস চুরি হয়ে যায়—এর চেয়ে কষ্টের বিষয় আর কী হতে পারে? এটা শুধু একটি জিনিস হারানো নয়। এটা একজন যাত্রীর বিশ্বাস হারানো।
আর যখন একজন মানুষ বিমানবন্দর থেকেই তার দেশের প্রতি, কিংবা নিজের দেশের ব্যবস্থাপনার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন, তখন এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যায়।
ট্রলি ব্যবস্থাপনাতেও একই চিত্র
পৃথিবীর বিভিন্ন বিমানবন্দরে আমি দেখেছি, যাত্রী কোথায় ট্রলি নেবে, কোথায় ফেরত দেবে, কোথায় অপেক্ষা করবে—সবকিছু একটি সিস্টেমের মধ্যে থাকে।
ট্রলি পেতে দেরি হলে পাশে বসার ব্যবস্থা থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ট্রলি আগে থেকেই নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হয়। আমাদের এখানে অনেক সময় একজন যাত্রীকে ট্রলির জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়, খুঁজতে হয়। এগুলো খুব বড় কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়। এগুলো ব্যবস্থাপনার সমস্যা।
সবচেয়ে বড় সমস্যা—কাজ না করার সংস্কৃতি
আমাদের সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে একটি প্রবণতা দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে—কাজ করার চেয়ে কাজ এড়িয়ে যাওয়া।
“আমি একটু ধীরে করি।” “অন্যজন করুক।” “আমি কেন করব?” “ও আগে করুক।”
আরেকজনের কাজের দিকে তাকিয়ে থাকা, ঊর্ধ্বতনকে খুশি রাখাকে কাজের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা—এসব সংস্কৃতি কোনো প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে পারে না।
তেলবাজি যদি কাজের বিকল্প হয়ে যায়, তাহলে দক্ষতা ও জবাবদিহি কখনো প্রতিষ্ঠিত হবে না।
কে কত ভালো কাজ করল—এটা মাপতে হবে। কে কত ভালো তেল মারল—এটা নয়।
সমাধান কী?
সমাধান খুব কঠিন কিছু নয়।
১. প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে।
২. প্রতিটি বিভাগের জন্য Quantity of Work ও Quality of Work-এর KPI নির্ধারণ করতে হবে।
৩. CCTV-এর মাধ্যমে শুধু নিরাপত্তা নয়, কাজের কার্যকারিতাও মনিটরিং করতে হবে।
৪. লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে বিমানভিত্তিক Service Level Agreement (SLA) থাকতে হবে।
৫. নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন না হলে জবাবদিহি থাকতে হবে।
৬. যাত্রীদের অভিযোগের জন্য কার্যকর এবং দ্রুত Complaint Resolution System থাকতে হবে।
৭. কর্মীদের প্রশিক্ষণে Passenger Service এবং Professional Behaviour বাধ্যতামূলক করা উচিত।
৮. সিনিয়র-জুনিয়ার নির্বিশেষে প্রত্যেককে তার নির্ধারিত কাজ করতে হবে।
৯. ভালো কাজের মূল্যায়ন হবে কাজের ভিত্তিতে—ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা তদবিরের ভিত্তিতে নয়।
বিমানবন্দর শুধু একটি প্রবেশদ্বার নয়
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একজন বিদেশি যখন বাংলাদেশে পা রাখেন, বিমানবন্দরই অনেক সময় তার বাংলাদেশের সঙ্গে প্রথম পরিচয়।
তিনি এখানেই প্রথম দেখেন আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ, আমাদের ব্যবস্থাপনা, আমাদের শৃঙ্খলা, আমাদের সেবা।
একজন বিদেশি ব্যবসায়ী যদি বাংলাদেশে এসে বিমানবন্দরেই হয়রানি, দীর্ঘ অপেক্ষা, অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ এবং অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হন, তাহলে তার ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সম্প্রতি একজন ইতালীয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি বাংলাদেশে এসে ব্যবসায়িকভাবে কিছু করার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ভ্রমণের পর বিমানবন্দরে এবং পরবর্তী যাত্রাপথে নানা ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত ফিরে যান।
একজন মানুষ হয়তো একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশে এলেন। কিন্তু বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতাই যদি তাকে হতাশ করে দেশে ফিরিয়ে দেয়, তাহলে এর অর্থনৈতিক মূল্য কত—আমরা কি কখনো সেটা হিসাব করি?
একজন যাত্রী শুধু একজন যাত্রী নন। তিনি একজন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, পর্যটক, প্রবাসী, দেশের প্রতিনিধি এবং একজন সম্ভাব্য দেশের শুভাকাঙ্ক্ষী।
তাই বিমানবন্দরে একজন যাত্রীকে “অপরাধী” হিসেবে নয়, একজন সম্মানিত কাস্টমার হিসেবে দেখতে হবে। নিরাপত্তা অবশ্যই থাকবে। কাস্টমসের আইন প্রয়োগ অবশ্যই হবে। ইমিগ্রেশনের যাচাইও অবশ্যই হবে। কিন্তু নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের সঙ্গে অসৌজন্য, হয়রানি ও অব্যবস্থাপনার কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের বিমানবন্দরের উন্নয়ন শুধু নতুন টার্মিনাল, নতুন ভবন, নতুন যন্ত্রপাতি বা নতুন রানওয়ে দিয়ে হবে না।
মানুষের মানসিকতার উন্নয়ন করতে হবে। কাজের সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আর সর্বোপরি—যাত্রীকে মানুষ এবং কাস্টমার হিসেবে সম্মান করতে হবে। কারণ বিমানবন্দর শুধু বাংলাদেশের দরজা নয়— এটাই বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের প্রথম পরিচয়।
পরামর্শ:
“ক্ষমতার সংস্কৃতি বনাম সেবার সংস্কৃতি: বদলাতে হবে মানসিকতা”
মফিজুর রহমান


