বাংলাদেশ আয়কর ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে সর্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতির আওতায় ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা এনবিআরের এক ইতিবাচক ও প্রযুক্তিবান্ধব সিদ্ধান্ত। তবে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রচার, তদারকি ও ডিজিটাল সক্ষমতার অভাবে মাঠপর্যায়ে এটি এক বড় আইনি ও আর্থিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে! অদক্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত ই-রিটার্ন ক্ষণিকের স্বস্তি দিলেও, করদাতার অজানাতেই পেছনে রেখে যাচ্ছে মারাত্মক সব আইনি জটিলতা।
এই অদক্ষ হাতে আয়কর রিটার্ন প্রস্তুত ও সাবমিশনে নানাবিধ আইনি জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছে করদাতা!
রাস্তার পাশের দোকানে ফাইল জমা: আইনি বিচ্যুতি ও বহুমাত্রিক ঝুঁকি
ডিজিটাল অবকাঠামোর সহজলভ্যতার অভাবে বহু করদাতা রাস্তার পাশের কম্পিউটার কম্পোজ বা ফটোকপির দোকান থেকে ই-রিটার্ন দাখিল করছেন। আয়কর আইন, ২০২৩-এর বিধি-বিধান সম্পর্কে বিন্দুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও এই অপারেটররা কেবল ডেটা এন্ট্রি করে ফাইল জমা দিচ্ছেন! আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতিতে একজন আয়কর আইনজীবী বা অনুমোদিত ট্যাক্স রিটার্ন প্রিপেয়ারার (TRP)-এর আইনি বিশ্লেষণ ক্ষমতা একজন সাধারণ অপারেটরের নেই। এর ফলে প্রতিনিয়ত যে আইনি লঙ্ঘনগুলো ঘটছে:
০১. আয় ও সম্পদের অসামঞ্জস্য (Wealth Unreconciled):
বিগত বছরের সম্পদ, চলতি বছরের নেট আয় এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে হিসাবের সমতা না রেখে মনগড়া সংখ্যা বসানো হচ্ছে। আয়কর আইনের আওতায় অপ্রদর্শিত এই গরমিলকে ‘অপ্রদর্শিত আয়’ বা ‘কালো টাকা’ হিসেবে গণ্য করে বিশাল অঙ্কের কর আরোপ করা হতে পারে।
০২. ভুল কর সার্কেল ও রেসিডেনশিয়াল স্ট্যাটাস:
করদাতার ভৌগোলিক এলাকা, কাজের ধরন ও আয়ের উৎস অনুযায়ী সঠিক কর সার্কেল ও জোন নির্বাচন অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ভুল তথ্য এন্ট্রির কারণে ফাইল ভুল সার্কেলে চলে গেলে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দেওয়া সত্ত্বেও তা ‘অকার্যকর’ বা ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে গণ্য হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
০৩. ভুল ও ভুয়া কর রেয়াত দাবি:
অনুমোদনহীন খাত বা অতিরিক্ত বিনিয়োগ দেখিয়ে কর রেয়াত (Tax Credit) দাবি করা গুরুতর অপরাধ। পরবর্তীতে কর কর্মকর্তা পর্যালোচনায় এটি মিথ্যা প্রমাণিত হলে আয়কর আইন অনুযায়ী কর ছাড় তো বাতিল হবেই, পাশাপাশি জরিমানাও গুনতে হবে।
০৪. করদাতার ব্যাংক হিসাব বিবরণী রিটার্নে উপস্থাপন না করা।
০৫. করদাতার ব্যয় হিসাব ও জীবনযাত্রার বিবরণী সঠিকভাবে তুলে না ধরা।
তাৎক্ষণিক একনোলজমেন্ট বনাম অডিট (Audit) ও নোটিশের হুমকি
অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সঙ্গে সঙ্গেই সিস্টেম থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এআই-জেনারেটেড প্রাপ্তিস্বীকার পত্র বা একনোলজমেন্ট স্লিপ চলে আসে। এতে সাধারণ করদাতারা মনে করছেন তাদের দায়িত্ব শেষ। কিন্তু আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী, স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে জমা হওয়া প্রতিটি ফাইলই পরবর্তীকালে রাজস্ব কর্মকর্তাদের অডিট বা নিরীক্ষার আওতায় আসার আইনগত ক্ষমতা রাখে।
ভবিষ্যতে যখন এই অসংলগ্ন ফাইলগুলো অডিটের মুখোমুখি হবে, তখন তথ্যের সত্যতা না থাকায় করদাতাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা, বকেয়া আয়করের ওপর চক্রবৃদ্ধি হারে বিলম্ব সুদ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে আয়কর ধারার আওতায় আইনি নোটিশ ও প্রসিকিউশনের মুখোমুখি হতে হবে। করদাতাকে মনে রাখতে হবে, রিটার্ন সাবমিটের পর কম্পিউটার অপারেটরের কোনো আইনি দায়বদ্ধতা থাকে না; সমস্ত আইনি দায়ভার একান্তই করদাতার নিজের।
ডেটা প্রাইভেসি ও সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি
অনলাইনে রিটার্ন জমাকালে জাতীয় পরিচয়পত্র, স্পর্শকাতর ব্যাংক স্টেটমেন্ট, স্থায়ী ও অস্থায়ী সম্পদের হিসাব এবং ব্যক্তিগত পাসওয়ার্ড উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে তৃতীয় পক্ষের কাছে। এই গোপনীয় তথ্য তৃতীয় কোনো অসৎ চক্রের হাতে গেলে জাতীয় পরিচিতি ও ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব সাইবার অপরাধ বা পরিচয় জালিয়াতির (Identity Theft) শিকার হতে পারে।
জরুরি ভিত্তিতে আইনি ও নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ
ই-রিটার্ন ব্যবস্থার সুফল বজায় রাখতে এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কালবিলম্ব না করে কিছু আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
০১. বাণিজ্যিক জালিয়াতি নিরোধ ও আইন প্রয়োগ:
এনবিআর অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান হতে প্রাপ্ত সনদধারী, টিআরপি বা নিবন্ধিত আইনজীবী ছাড়া অন্য কোথাও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আয়কর ফাইল প্রস্তুত করা বেআইনি ঘোষণা করা এবং দোকানে দোকানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
০২. বিনামূল্যে সার্কেলভিত্তিক লিগ্যাল হেল্প ডেস্ক:
প্রতিটি কর অঞ্চলে সাধারণ করদাতাদের সরাসরি আইনি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য এনবিআরের দক্ষ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিনামূল্যে পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন করা।
০৩. আইনি ঝুঁকি বিষয়ে রাষ্ট্রীয় প্রচার:
সস্তায় বা অসচেতনভাবে রিটার্ন জমা দেওয়ার পরবর্তী আইনি পরিণতি, অডিট ঝুঁকি এবং বিপুল আর্থিক জরিমানার হুমকি সম্পর্কে গণমাধ্যমে রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে সতর্কতামূলক গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা।
০৪. দক্ষ জনবল তৈরি:
এনবিআরকে আরও ব্যাপক সংখ্যক আয়কর পরামর্শক তৈরির বিভিন্ন ইনস্টিটিউটে আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতি ও আয়কর আইন বিষয়ক কোর্স চালু করতে হবে। দক্ষ ও আয়কর আইনে পারদর্শী পেশাজীবীরা রাজস্ব আদায় ও আয়করদাতাদের ভোগান্তি কমাতে আরও অগ্রণী ভূমিকা রাখবে এবং সহজ শর্তে পরামর্শকদের নিবন্ধন নিশ্চিত করে নাগরিকদের সেবা নিশ্চিত করবেন।
প্রযুক্তি আমাদের কাজকে সহজ করে, কিন্তু আইন আইনের গতিতেই চলে। আয়কর আইন না জেনে ভুল তথ্য দিয়ে ফাইল জমা দেওয়া প্রকারান্তরে নিজের হাতে আইনি ফাঁদ তৈরি করার শামিল। তাই অনভিজ্ঞ অপারেটরদের বর্জন করে আইনি পথ অনুসরণ করা এবং রাজস্ব কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোই এই সংকট সমাধানের একমাত্র পথ।
লেখক : প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম
পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট
