জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাব টেকনিশিয়ান উম্মে হাবিবার পদোন্নতি ও পদায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি বিভিন্ন নথি পর্যালোচনায় তার চাকরিজীবনে একাধিক পদোন্নতি, পদায়ন এবং নিয়োগবিধি অনুসরণের বিষয়টি নিয়ে অসংগতি থাকার অভিযোগ সামনে এসেছে।
নথি অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা উম্মে হাবিবা পরবর্তী সময়ে সহকারী কেমিস্ট এবং কেমিস্ট পদে পদোন্নতি পান। সর্বশেষ গত ১৮ আগস্ট তাকে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের আইভি ফ্লুইড বিভাগের সুপারিনটেনডেন্ট পদে পঞ্চম গ্রেডে পদায়ন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তার পদোন্নতি ও পদায়নের বিভিন্ন ধাপে নিয়োগবিধি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) ভূমিকা এবং পূর্বে উত্থাপিত অভিযোগ যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
ল্যাব টেকনিশিয়ান থেকে সহকারী কেমিস্ট
সরকারি নথি অনুযায়ী, উম্মে হাবিবা উপজেলা স্বাস্থ্য প্রকল্প থেকে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রাজস্ব খাতের একটি শূন্য পদে ল্যাব টেকনিশিয়ান হিসেবে বদলি হয়ে আসেন। তবে প্রকল্পের পদ থেকে রাজস্ব খাতের পদে তার বদলির প্রক্রিয়াটি নিয়েও বিধি অনুসরণের প্রশ্ন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ২০০৬ সালের ৩ ডিসেম্বর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তৎকালীন পরিচালক ডা. মো. ময়েজ উদ্দীনের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে তাকে সহকারী কেমিস্টের শূন্য পদে নিজ বেতনে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অভিযোগের মূল জায়গাগুলোর একটি হলো, সহকারী কেমিস্ট পদে দায়িত্ব পালনের জন্য কেমিস্ট্রিতে স্নাতক ডিগ্রির প্রয়োজন থাকলেও উম্মে হাবিবার এমন শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পরের বছর, ২০০৭ সালের ৫ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সিনিয়র ল্যাব টেকনিশিয়ান, চিফ ল্যাব টেকনিশিয়ান, সিনিয়র টেকনিশিয়ান ও চিফ টেকনিশিয়ান পদগুলোর নাম পরিবর্তন করে সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) করা হয়। একই সঙ্গে এসব পদকে দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেওয়া হয়।
একই সময়ে দুই পদে থাকার প্রশ্ন
২০১১ সালের ৩ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে উম্মে হাবিবার চাকরি ২০০৬ সালের ৩ ডিসেম্বর থেকে সহকারী কেমিস্ট হিসেবে স্থায়ী করার কথা বলা হয়।
অর্থাৎ, যে তারিখে তাকে সহকারী কেমিস্ট পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেই তারিখ থেকেই ওই পদে তার চাকরি স্থায়ী করা হয়। এতে একই সময়ে তার সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও সহকারী কেমিস্ট পদে থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে সহকারী কেমিস্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি নিয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিতে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পদোন্নতি নিয়ে গঠিত হয়েছিল কমিটি
উম্মে হাবিবাকে সহকারী কেমিস্ট পদে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে আপত্তি ওঠে। ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এ বি এম মুজহারুল ইসলামের স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে দ্বিতীয় শ্রেণির বিভিন্ন শূন্য পদে নিজ বেতনে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার আদেশ জারি করা হয়।
সংশ্লিষ্ট নথিতে এসব পদায়ন অনুমোদিত কার্যপরিধি ও প্রচলিত নিয়োগবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে উম্মে হাবিবাকে কেমিস্ট পদে পদোন্নতির জন্য প্রস্তাব পাঠানো হলে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। বিষয়টি পর্যালোচনা করতে ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (শৃঙ্খলা) ডা. হেলিশ রঞ্জন সরকারের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়।
পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে থাকা অসংগতিগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ওই কমিটিকে। কমিটি পরবর্তীতে সুপারিশও দেয়। তবে সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এর মধ্যেই ২০২০ সালের ৮ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব খন্দকার জাকির হোসেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি দিয়ে নবম গ্রেডের কেমিস্ট পদে উম্মে হাবিবাকে পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠাতে বলেন।
এর প্রায় এক বছর পর ২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জাকিয়া পারভীনের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে তাকে নবম গ্রেডের কেমিস্ট পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
নিয়োগবিধি পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কেমিস্ট পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধিতে ফিডার পদে নির্দিষ্ট সময় চাকরির পাশাপাশি কেমিস্ট্রি বিষয়সহ বিএসসি ডিগ্রির শর্ত ছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৭৫ ও ১৯৭৯ সালের নিয়োগবিধিতেও কেমিস্ট পদে শিক্ষাগত যোগ্যতার একই ধরনের শর্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফা নিয়োগবিধি সংশোধন করা হয়।
১৯৮৫ সালের সংশোধনে নবম গ্রেডের কেমিস্ট পদের ফিডার পদ হিসেবে নবম গ্রেডের বায়োকেমিস্ট পদ নির্ধারণ করা হয়। পরে ২০১৩ সালের ১১ মে নিয়োগবিধিতে আবার পরিবর্তন আনা হয়।
এই সংশোধিত বিধিতে ফিডার পদের শিক্ষাগত যোগ্যতায় কেমিস্ট্রি বিষয় রাখার বিষয়টি নিয়ে উম্মে হাবিবাসহ কয়েকজন সরকারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন। মামলাটির নম্বর ৭৯৩১/২০১৩।
নথি অনুযায়ী, ওই রিটের চূড়ান্ত রায় সংশোধিত নিয়োগবিধির পক্ষে যায়। রায়ে সিনিয়র ল্যাব টেকনিশিয়ান, চিফ ল্যাব টেকনিশিয়ান ও চিফ টেকনিশিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট পদগুলোর শ্রেণিগত পরিবর্তনের বিষয়টিও উঠে আসে।
তবে পরবর্তী সময়ে নিয়োগবিধি পরিবর্তনের মাধ্যমে উম্মে হাবিবার কেমিস্ট পদে পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল কি না—এ নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
গ্রেডেশন তালিকা নিয়েও আপত্তি
উম্মে হাবিবার পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় গ্রেডেশন তালিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালকের গঠিত কমিটি ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর একটি গ্রেডেশন তালিকা তৈরি করে।
ওই তালিকায় কারও আপত্তি থাকলে দুই কর্মদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে উম্মে হাবিবা প্রতিষ্ঠানের কমিটির পরিবর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অভিযোগ করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নতুন একটি গ্রেডেশন তালিকা তৈরি করে। এতে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রস্তুত করা আগের তালিকার পরিবর্তে নতুন তালিকা ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এ ছাড়া উম্মে হাবিবার সহকারী কেমিস্ট পদে পদায়নের ক্ষেত্রে পিএসসির সুপারিশ প্রয়োজন নেই—এমন ব্যাখ্যাও নথিতে পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই ব্যাখ্যার সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের বিজ্ঞপ্তির অসঙ্গতি রয়েছে।
অভিযোগের নিষ্পত্তির আগেই পদোন্নতি
উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে মতামত চাওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
তবে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই ২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তাকে কেমিস্ট পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতেও অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে মতামত চাওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এরপরও অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি না করে সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ইমতিয়াজ হোসেন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে তাকে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের আইভি ফ্লুইড বিভাগের সুপারিনটেনডেন্ট পদে পদায়ন করা হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকেও মতামত চাওয়া হয়েছিল
উম্মে হাবিবাসহ সংশ্লিষ্টদের পদোন্নতি ও নিয়োগবিধি নিয়ে মামলা চলাকালে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে বিভিন্ন বিষয়ে দফাওয়ারি মতামত চাওয়া হয়েছিল। এ-সংক্রান্ত চিঠি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালকের কাছেও পাঠানো হয়।
তবে এসব অভিযোগ ও প্রশ্নের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
উম্মে হাবিবার বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে উম্মে হাবিবা বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় যদি নিয়োগবিধি অনুসরণ না করে তার পদায়ন বা পদোন্নতি দিয়ে থাকে, তাহলে অভিযোগকারীদের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তিনি আরও দাবি করেন, যারা দুর্নীতির মাধ্যমে আইভি ফ্লুইড বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন, তারাই তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলছেন।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী বলেন, তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র এক মাস আগে। ফলে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব তথ্য এখনো তার জানা হয়নি। তবে উম্মে হাবিবার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
