৯৪ সাবেক শ্রমিকের ১,৪৮১ কোটি টাকা পাওনার দাবি, বিপুল লভ্যাংশ ভারতে পাঠানোর অভিযোগ ।
শ্রমিকদের আইনগত পাওনা পরিশোধ না করে কোম্পানির বিপুল মুনাফা ও নগদ লভ্যাংশ বিতরণ এবং মামলার বিচারাধীন সময়ে অর্থ ও সম্পদ বিদেশে স্থানান্তরের আশঙ্কায় ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)-এর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে শ্রম আদালতে আবেদন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক শ্রমিকরা।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট ২০২৬) ঢাকার প্রথম শ্রম আদালতে দায়ের করা বিএলএ মামলা নম্বর ৮৬৫/২০২৫-এর আওতায় এ আবেদন করা হয়। আবেদনে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানির এমডি যেন আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়া বাংলাদেশ ত্যাগ করতে না পারেন, সে বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষামূলক আদেশ চাওয়া হয়েছে।
আবেদনকারীদের দাবি, ম্যারিকো বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ শেয়ারের মালিক ভারতের ম্যারিকো লিমিটেড। তাদের অভিযোগ, ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডে কর্মরত থাকা অবস্থায় তারা শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল (WPPF) ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের আইনগত পাওনা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত হয়ে আসছেন।
শ্রমিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পাওনা আদায়ের দাবিতে প্রথমে ১৯ জন শ্রমিক ২০১৪ সালে শ্রম আদালতে মামলা নম্বর ৬৯১/২০১৪ দায়ের করেন। পরবর্তীতে ওই মামলাকে কেন্দ্র করে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন নম্বর ৫৭৬/২০১৮ নিষ্পত্তি না হওয়ায় শ্রম আদালতের বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হয়। পরে প্রতিকারের আশায় আরও ৯৪ জন সাবেক শ্রমিক ২০২৫ সালে বিএলএ মামলা নম্বর ৮৬৫/২০২৫ দায়ের করেন।
আবেদনকারীদের দাবি, একটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের স্বতন্ত্র নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ৯৪ জন সাবেক শ্রমিকের মোট পাওনা প্রায় ১ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তবে এ দাবির বিষয়ে কোম্পানির পক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন তাদের আইনগত পাওনা অনাদায়ী থাকলেও একই সময়ে কোম্পানি বিপুল পরিমাণ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা ও বিতরণ করেছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ম্যারিকো বাংলাদেশ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২০০ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৮৪০ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।
শ্রমিকদের আশঙ্কা, কোম্পানির বিপুল পরিমাণ নগদ লভ্যাংশ বিতরণ এবং ভারতে অর্থ স্থানান্তরের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আদালতের রায় তাদের পক্ষে গেলে তা বাস্তবায়নের সময় পাওনা আদায় জটিল হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া কোম্পানির বর্তমান এমডি ভারতীয় নাগরিক এবং নিয়মিত বিদেশ সফর করেন—এ বিষয়টিও আদালতের বিবেচনায় আনা হয়েছে বলে জানান আবেদনকারীরা।
তবে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কোনো ব্যক্তির স্বাভাবিক চলাচলের অধিকারে অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে চান না। দীর্ঘদিন ধরে চলমান শ্রমিকদের পাওনা সংক্রান্ত বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং সম্ভাব্য আদালতের রায় কার্যকর রাখার স্বার্থেই সাময়িক সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা চাওয়া হয়েছে।
‘এক্স-ম্যারিকোনিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’-এর সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, “আমরা কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো অন্যায্য সুবিধা চাই না; আমরা চাই আইন অনুযায়ী আমাদের পাওনা পরিশোধ এবং দীর্ঘদিনের বিরোধের ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি। শ্রমিকের পাওনা বছরের পর বছর অনাদায়ী রেখে বিপুল লভ্যাংশ বিতরণের বিষয়টি আদালতের যথাযথ পর্যালোচনা ও জবাবদিহির আওতায় আসা প্রয়োজন।”
সাবেক শ্রমিকদের ভাষ্য, বিষয়টি শুধু আর্থিক পাওনা আদায়ের বিরোধ নয়; এর সঙ্গে শ্রমিকদের আইনগত অধিকার, কর্পোরেট জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নও জড়িত। আদালতের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এ বিরোধের দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি চান তারা।
