গতকাল ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। তিনি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে; মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
কিন্তু এই মৃত্যুর পেছনের পুরো ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সামনে কিছু কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়।
কয়েক মাস আগে একজন তরুণীর সঙ্গে ওই এমপির ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি প্রকাশ্যে ওই তরুণীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করেন এবং বিয়ের কথা জানান। এরপর জামায়াতে ইসলামী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—একজন ১৯ বছরের মেয়ের জীবনে এর পর কী ঘটেছিল?
সে কি সত্যিই নিজের ইচ্ছায় এই সম্পর্ক ও বিয়েতে গিয়েছিল?
নাকি ক্ষমতা, চাকরির আশ্বাস, সামাজিক চাপ কিংবা অন্য কোনো পরিস্থিতি তাকে এমন একটি সম্পর্কে যেতে বাধ্য করেছিল?
যদি কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি একজন তরুণীর অসহায়ত্ব বা চাকরির প্রয়োজনকে ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে সেটি কি শুধু ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা?
আর যদি বিয়েটি সত্যিই হয়ে থাকে, তাহলে সেই বিয়ের পর মেয়েটির সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান কী ছিল?
একজন ১৯ বছরের মেয়েকে এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হলো, যেখানে একদিকে ছিল একজন ক্ষমতাবান সংসদ সদস্য, অন্যদিকে সামাজিক বাস্তবতা, পরিবার এবং প্রবল জনসমালোচনা।
সবচেয়ে বেশি কষ্টের জায়গাটি হলো—এই মেয়েটি শেষ পর্যন্ত কী অনুভব করছিল, আমরা কি কখনো জানতে পারব?
তার বাবা-মা যে সময়ে মেয়ের বিয়ের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন, আজ মেয়ের মৃত্যুর পর তাদের অবস্থান কী?
তারা কি জানতেন মেয়েটি কেমন জীবন কাটাচ্ছিল?
কেউ কি জানতে চেয়েছিল—ন্যাম ভবনে থাকার সময় মেয়েটি কেমন ছিল, কার সঙ্গে কথা বলত, কী অবস্থার মধ্যে দিন কাটাত?
আরও বড় প্রশ্ন—একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত আচরণ যখন জনসম্মুখে আসে এবং তার সঙ্গে একজন তরুণীর জীবন জড়িয়ে যায়, তখন শুধু দলীয় বহিষ্কারই কি যথেষ্ট জবাবদিহিতা?
সংসদীয় নৈতিকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, একজন তরুণীর নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য কোনো অপরাধের অভিযোগ—এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কি কোনো প্রশ্ন করার দায়িত্ব নেই?
আমি কাউকে অপরাধী বলছি না।
কারণ সত্য উদঘাটনের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার।
কিন্তু আমি প্রশ্ন করতে চাই—
এই মেয়েটির মৃত্যুর আগে তার কষ্টটা কে দেখেছিল?
তার কথা কে শুনেছিল?
তার পাশে কে দাঁড়িয়েছিল?
এটা কি অন্য ১০ টি আত্মহত্যার মতো সাভাবিক নাকি টেলর এর শেষ পরিণতি এমনই হবে আমরা কম বেশি সবাই জানতাম?
আর যদি সত্যিই কোনো অন্যায়, চাপ, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা জোরপূর্বক পরিস্থিতি এই মৃত্যুর পেছনে থেকে থাকে—
তাহলে দায়টা আমরা কাকে দেব?
পরিবারকে?
ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে?
সমাজকে?
রাষ্ট্রকে?
সামাজিক যুগযোগ মাধ্যম যারা তাদের ভিডিও ভাইরাল করেছিলো?
নাকি আমাদের নীরবতাকে?
নাকি বাবা-মা কে যারা পুলিশি প্রোটোকল পেরিয়ে মেয়ের খোঁজ নিয়ার সাহস পাই নাই বা আজও সাহস সাহস পেল না থানায় এসে নিথর দেহটা দেখার?
আর সবচেয়ে নির্মম প্রশ্ন—
মৃত্যুই কি তাহলে এই মেয়েটির শেষ পর্যন্ত মুক্তির একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়িয়েছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মরিয়মের জন্য নয় শুধু—আমাদের সমাজের প্রতিটি অসহায় মেয়ের জন্য প্রয়োজন।
আরেকটা প্রশ্ন—মানবাধিকার কর্মীরা কোথায়? নারী অধিকারকর্মীরা কোথায়?
একসময় তো প্রায় প্রতিদিনই শুনতাম—মানবাধিকার সংস্থা, নারী অধিকার সংস্থা, বিভিন্ন এনজিও, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার বিভিন্ন সংগঠন।
আজ একজন ১৯ বছরের মেয়ে—মরিয়ম—একজন ক্ষমতাবান সংসদ সদস্যের সঙ্গে সম্পর্ক, বিয়ে, সামাজিক চাপ এবং নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল।
এই ঘটনায় তাদের কোনো বক্তব্য আছে কি?
কেউ কি প্রশ্ন করেছে—এই মেয়েটির সঙ্গে কী হয়েছিল?
কেউ কি জানতে চেয়েছে—সে কী অবস্থার মধ্যে ছিল?
কেউ কি তার পরিবারের কাছে গেছে?
কেউ কি রাষ্ট্রের কাছে জবাব চেয়েছে?
নাকি মানবাধিকার ও নারী অধিকারও এখন ঘটনাভেদে, মানুষভেদে, ক্ষমতাভেদে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ভেদে কথা বলে?
আমি কাউকে অভিযুক্ত করছি না। তদন্ত হোক, সত্য বেরিয়ে আসুক।
কিন্তু যারা বছরের পর বছর নারী অধিকার ও মানবাধিকারের কথা বলেছেন, তাদের কাছে আমার খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন—
আজ যখন একজন তরুণীর জীবন শেষ হয়ে গেল, তখন আপনারা কোথায়?
আপনাদের কণ্ঠ কি হারিয়ে গেছে?
নাকি এই মরিয়মের মতো আপনারাও কোথাও হারিয়ে গেলেন?
