একজন পরিচিত ইসলামি বক্তা, লেখক ও উদ্যোক্তা। তাঁকে ঘিরে কয়েক মাস ধরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। কখনো একাধিক বিয়ের দাবি, কখনো নারীসংক্রান্ত অভিযোগ, আবার কখনো ব্যক্তিগত ভিডিও ও মামলা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিষয় নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এর মধ্যে নতুন করে সামনে এসেছে এক রোহিঙ্গা নারীকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এনে তিন দিন আটকে রাখার অভিযোগ।
মুফতী হাবিবুর রহমান মিছবাহর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের পেছনে রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করা এবং তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করাই এই চক্রের উদ্দেশ্য। এ কাজে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হুমায়রা জান্নাত ওরফে নাঈমা, সাবেক ব্যক্তিগত সচিব ইমরান আল হাসান এবং কয়েকজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
অন্যদিকে, মিছবাহর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও বিয়ে নিয়ে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলোও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
প্রাপ্ত নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং মিছবাহর পক্ষ থেকে দেওয়া বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাপ্রবাহ অনুসন্ধান করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া কোনো পক্ষের বক্তব্যকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
মিছবাহর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৪ আগস্ট তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হুমায়রা জান্নাত ওরফে নাঈমা বাবার বাড়িতে চলে যান। এরপর থেকে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। মিছবাহর দাবি, বাসা ছাড়ার আগে তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কে বড় ধরনের কোনো সংকট ছিল না।
তবে নাঈমার বাসা ছাড়ার কারণ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে মিছবাহর ব্যক্তিগত জীবন, একাধিক বিয়ে এবং নারীসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে। এসব অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
মিছবাহর অভিযোগ, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একের পর এক তথ্য প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা। এমনকি প্রায় ২০ বছর আগের পারিবারিক বিয়ে ও বিচ্ছেদের প্রসঙ্গও সামনে আনা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি এসেছে এক রোহিঙ্গা নারীকে ঘিরে।
মিছবাহর পক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর কয়েকজন ব্যক্তি চট্টগ্রামে ওই নারীর বাড়িতে যান। পরে ৩ অক্টোবর তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ওই নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বক্তব্য দিয়েছিলেন, যেখানে মুফতী মিছবাহর সঙ্গে তাঁর বিয়ের দাবি সামনে আসে। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর আরেকটি বক্তব্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে মিছবাহর পক্ষ। সেখানে ওই নারী বলেছেন, তাঁকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এনে তিন দিন আটকে রাখা হয়েছিল এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, এ ঘটনায় নাঈমা, ইমরান, এস এম সাইফুল ইসলাম, আহমেদ নাঈম ও ডা. ইব্রাহীম খলিলের নাম এসেছে।
ওই নারীর বক্তব্যের সত্যতা এবং তাঁকে আটকে রাখার অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তিনি কোথায় ছিলেন, কারা তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন এবং কী পরিস্থিতিতে বক্তব্য দিয়েছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।
আরও একটি বিষয় সামনে এনেছেন মিছবাহর পক্ষ। তাঁদের দাবি, নাঈমার সঙ্গে ওই নারীর আগে থেকেই পরিচয় ছিল। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে ঢাকায় আসার সময় একটি প্র্যাঙ্ক ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়।
মিছবাহর ব্যক্তিগত শয়নকক্ষে ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও এই বিরোধের অংশ হয়ে উঠেছে।
মিছবাহর অভিযোগ, তাঁর স্ত্রী নাঈমা ওই কক্ষে গোপন ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন। ১২ আগস্ট পল্টনের ফারস হোটেলে দুই পক্ষের আইনজীবী ও অন্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে নাঈমা বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন বলে দাবি তাঁর।
একই বৈঠকে একটি হোয়াটসঅ্যাপ ডিভাইস নেওয়ার বিষয়েও স্বীকারোক্তি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন মিছবাহ।
এ ঘটনায় নাঈমার তৎকালীন আইনজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস পরবর্তী সময়ে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট দিয়ে মামলা পরিচালনা থেকে সরে দাঁড়ান বলে মিছবাহর পক্ষ জানিয়েছে।
তবে বৈঠকের লিখিত কার্যবিবরণী, উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আইনজীবীর পোস্টের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করা প্রয়োজন।
মিছবাহর অভিযোগের একটি বড় অংশের কেন্দ্রে রয়েছেন তাঁর সাবেক ব্যক্তিগত সচিব ইমরান আল হাসান।
মিছবাহর দাবি, ব্যবসায়িক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ইমরানকে তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মাদানীনগরে জুব্বা ও কটি তৈরির ব্যবসায় প্রায় ৩০ লাখ টাকার আর্থিক গরমিল এবং গাড়ির কাজের ভাউচারে অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
এ বিষয়ে গাড়িচালকের ভিডিও বক্তব্য ও কিছু ব্যবসায়িক নথি থাকার কথা জানিয়েছে তাঁর পক্ষ।
এ ছাড়া ইমরানের সঙ্গে নাঈমার যোগাযোগ ও সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন মিছবাহ। ইমরানের স্ত্রী সাবিকুন্নাহারও তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনের তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ইমরান ও নাঈমার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য ছাড়া অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
মুফতী মিছবাহর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এজাহার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তাঁর পক্ষ।
তাঁদের দাবি, এজাহারে ২০২০ সালের ৪ মে কুতুবখালী স্টিল বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ভবনটি ২০২৪ সালের আগে উদ্বোধন হয়নি বলে দাবি করা হচ্ছে। ভবনটির তৃতীয় তলায় কোনো আবাসিক বাসা নেই, সেখানে করপোরেট অফিস রয়েছে বলেও দাবি মিছবাহর পক্ষের।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ভবনটির নির্মাণ ও উদ্বোধনের নথি, পরিচালনা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
মামলার অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা তদন্তেই পরিষ্কার হওয়া সম্ভব।
মিছবাহকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি তাঁর একাধিক বিয়ের অভিযোগ।
মিছবাহর পক্ষের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় নয়টি বিয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরে একজন আইনজীবীর বক্তব্যে দশটি বিয়ের প্রসঙ্গও সামনে আসে।
অন্যদিকে, নাঈমার পাঠানো একটি উকিল নোটিশে তাঁকে মিছবাহর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মিছবাহ। ২০২১ সালে পারিবারিক প্রস্তাবের মাধ্যমে কাবিন রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মিছবাহর পক্ষ থেকে কাবিননামা এবং বিয়ের প্রস্তাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, নয় বা দশটি বিয়ের অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের নথি রয়েছে? সংশ্লিষ্ট নারীদের পরিচয় ও বিয়ের তথ্য কি যাচাই করা হয়েছে? মামলায় উত্থাপিত অভিযোগ এবং উকিল নোটিশে থাকা তথ্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য রয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। কারণ, কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য দিয়ে কারও বৈবাহিক ইতিহাস নিশ্চিত করা যায় না।
পারিবারিক বিরোধের পাশাপাশি মিছবাহর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ৩১৩ কোম্পানিকে ঘিরেও অভিযোগ উঠেছে।
মিছবাহর দাবি, তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকারীদের ফোন করে অভিযোগ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এস এম সাইফুল ইসলামের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
তাঁর দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে কোম্পানিটির প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তবে এত বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির দাবি যাচাই করতে কোম্পানির নিরীক্ষিত হিসাব, বিনিয়োগকারীদের বক্তব্য, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
মুফতী হাবিবুর রহমান মিছবাহকে ঘিরে চলমান বিরোধের ঘটনাপ্রবাহে একাধিক পক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে একজন নারীকে আটকে রেখে বক্তব্য আদায়ের অভিযোগ, ব্যক্তিগত কক্ষে গোপন ক্যামেরা স্থাপন, ডিজিটাল তথ্য ব্যবহার, একাধিক বিয়ের দাবি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করার অভিযোগ।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এ ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বিশেষভাবে জরুরি। রোহিঙ্গা নারীকে সত্যিই আটকে রাখা হয়েছিল কি না, তাঁর বক্তব্য কোন পরিস্থিতিতে ধারণ করা হয়েছে, মামলার এজাহারে উল্লেখ করা সময় ও স্থানের তথ্য কতটা সঠিক, একাধিক বিয়ের অভিযোগের পক্ষে কী নথি রয়েছে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতির দাবির ভিত্তি কী?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত।
ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে কেউ যদি মিথ্যা অভিযোগের শিকার হয়ে থাকেন, তাঁর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আবার কারও বিরুদ্ধে প্রকৃত অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেটিও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি।
এই বিরোধের নিষ্পত্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় নয়, বরং প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াতেই হওয়া উচিত।


