বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত যখন মানসম্মত, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন কেন্দ্রীয় ওষুধাগার অধিদপ্তর (সিএমএসডি) ঘিরে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপনের সময়ে সিএমএসডিতে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের মাধ্যমে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহে অনিয়ম এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সিএমএসডির ঠিকাদার মো. হারুন আর রশিদের বিরুদ্ধে করা একটি অভিযোগে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, সরঞ্জাম সরবরাহ না করেও বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলন করা হয়েছে। সিএমএসডির বর্তমান ও সাবেক একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকে অভিযোগ
অভিযোগকারী খালেদ সাইফুল্লা নাঈম বলেন, তিনি জুলাই আন্দোলনের একজন যোদ্ধা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা করছেন। তার দাবি, গত ১০ আগস্ট তিনি দুদকে অভিযোগটি জমা দেন। সে সময় কমিশনে চেয়ারম্যান ও কমিশনার না থাকায় নতুন চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি তদন্তের আবেদন জানানোর কথা জানিয়েছেন তিনি।
দুদকের এক পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযোগটি চেয়ারম্যানের সামনে উপস্থাপন করা হবে। সেখান থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হবে, সে অনুযায়ী পরবর্তী তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
দরপত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে অভিযোগ
দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, আগের সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ ছিল। সেখানে হারুন আর রশিদ সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার হিসেবে প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সিএমএসডিতে দরপত্র ছাড়াই বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউ বেড, সাধারণ বেড, ভেন্টিলেটর, অপারেশন থিয়েটারের লাইট, রোগী পর্যবেক্ষণ মনিটর, আলট্রাসাউন্ড ও এমআরআই মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহ এবং আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরঞ্জাম না দিয়েই বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। একই ধরনের অনিয়ম জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহের ক্ষেত্রেও হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
ঠিকাদারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. হারুন আর রশিদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে কল ও খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে তার পক্ষে হুমায়ুন কবির নামে একজন ফোন করে জানান, হারুন আর রশিদ বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। পরে খোঁজ নিয়ে তিনি দেশেই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বিপুল সম্পদের অভিযোগ
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে হারুন আর রশিদের নামে ও বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকার দাবিও করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, ঢাকার রামপুরার বনশ্রী জি ব্লকের মোনটিয়ার প্লেসে ৪ ও ৫ নম্বর ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। বনশ্রীর বিভিন্ন ব্লকে তার আরও পাঁচটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যেগুলোর আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের বিপরীতে বিএমএ ভবনের তৃতীয় তলায় ‘হারুন এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি দোকানের কথাও অভিযোগে বলা হয়েছে। এর মূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া আফতাবনগরে তার নামে ও বেনামে চার থেকে পাঁচটি প্লট, মৌচাক মার্কেটের বিপরীতে ফরচুন টাওয়ারে একটি দোকান এবং প্রায় ৩০ লাখ টাকা মূল্যের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি থাকার দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গাজীপুরে হারুন আর রশিদের ২০ কাঠা ও পাঁচ কাঠার দুটি প্লট রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কাছিপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে তিনতলা ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রায় ৫০ একর কৃষিজমি, বাগান ও একাধিক পুকুর রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সম্পদের আনুমানিক মূল্য ৭ থেকে ৮ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
