শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবন ও কর্মক্ষেত্রে কার্যকরভাবে ইংরেজি ব্যবহারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। পেশাভেদে ইংরেজি ব্যবহারের ধরন ও প্রয়োজন ভিন্ন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পেশার কথা বিবেচনায় নিয়ে ভাষা শেখানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বক্তারা। তাঁদের মতে, ইংরেজিতে দক্ষতার ঘাটতি অনেক শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও যোগ্যতার যথাযথ প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রচলিত ভাষাশিক্ষার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার এবং বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) স্থায়ী ক্যাম্পাসে আয়োজিত ‘ইউল্যাব-টিইএসওএল বিডি সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন ইএসপি’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা এ সম্মেলনের যৌথ আয়োজক ইউল্যাব ও টিইএসওএল সোসাইটি অব বাংলাদেশ।
সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ফ্রম মার্জিন টু মেইনস্ট্রিম: রিস্ট্রাকচারিং ইনস্টিটিউশনাল ইএসপি ফর সাস্টেইনেবল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট’। এর মূল লক্ষ্য হলো, টেকসই জাতীয় উন্নয়নের প্রয়োজনের সঙ্গে ইংরেজি শিক্ষাকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা এবং শিক্ষার্থীদের পেশাগত জীবনের উপযোগী ভাষাদক্ষতা গড়ে তোলার পথ খুঁজে বের করা।
কর্মক্ষেত্রের উপযোগী ইংরেজি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের দায়ী না করে ভাষা শেখানোর প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ইংরেজি পড়াশোনা করার পরও অনেকে বাস্তব জীবনে ও কর্মক্ষেত্রে ভাষাটি ব্যবহার করতে সমস্যায় পড়েন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইংরেজি শুধু দৈনন্দিন যোগাযোগের মাধ্যম নয়; প্রকৌশল, ব্যবসা, ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি শিক্ষায়ও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভাষাগত দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় নিজেদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেন না। এর প্রভাব তাঁদের পেশাগত অগ্রগতিতেও পড়তে পারে।
দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জনে দক্ষ কর্মী তৈরি করা জরুরি। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে ভাষাগত ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে।
ইংরেজি শিক্ষায় এআই ব্যবহারের পরামর্শ
সম্মেলনের শুরুতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিজিটাল ইংরেজি শিক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান রিয়েলিইংলিশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাইজেল কিলিক। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের এমনভাবে ইংরেজি শেখানো উচিত, যাতে তাঁরা বাস্তব জীবন ও কর্মক্ষেত্রে অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন। দীর্ঘ সময় ইংরেজি পড়াশোনা করেও অনেক শিক্ষার্থী ভাষাটিতে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন না। এ সমস্যা দূর করতে ব্যবহারিক অনুশীলন বাড়ানো প্রয়োজন।
নাইজেল কিলিকের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কম খরচে ইংরেজিতে কথা বলার অনুশীলন, ভুল শনাক্তকরণ এবং তাৎক্ষণিক সংশোধনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। পাশাপাশি বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম, স্থানীয় পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্য উপকরণ তৈরিতেও এআই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে কোন পেশায় যুক্ত হবেন, তা বিবেচনায় রেখে ভাষাশিক্ষার পরিকল্পনা করা দরকার। এ জন্য ইংরেজি বিভাগের শিক্ষকদের প্রকৌশল, চিকিৎসা ও ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা পেশাগত জীবনে প্রয়োজনীয় ভাষাদক্ষতা অর্জন করতে পারবেন।
পেশাভিত্তিক ভাষাশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা
সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মাসুমা হাবিব বলেন, ইংরেজি শিক্ষায় শুধু ব্যাকরণ ও পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ভাষাটি ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এ জন্য পেশাভিত্তিক ভাষাশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তাঁরা কাজের প্রয়োজনে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারেন।
প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইংরেজি শেখানোর ব্যবস্থা করা জরুরি।
স্বাগত বক্তব্যে ইউল্যাবের উপাচার্য অধ্যাপক সামসাদ মর্তূজা বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু ইংরেজি শেখানো যথেষ্ট নয়; বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ভাষাটি ব্যবহারের দক্ষতাও গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে পেশাভিত্তিক ভাষাশিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর প্রয়োগ এবং তৃতীয় ভাষা শেখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
গবেষণা ও সহযোগিতা বাড়ানোর প্রত্যাশা
সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বের শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ইউল্যাবের সেন্টার ফর ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজের (সিএলএস) পরিচালক ফাহিম হাসান সাহেদ। তিনি বলেন, বিভিন্ন পেশায় ইংরেজি ব্যবহারের প্রয়োজন ও ধরন এক নয়। তাই ভাষাশিক্ষাকে পেশাগত চাহিদা, ব্যক্তিগত প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
টিইএসওএল সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ইউল্যাবের সেন্টার ফর ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজ এবং টিইএসওএল সোসাইটি অব বাংলাদেশের মধ্যে এ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অংশীদারত্বের সূচনা হয়েছে। এর ফলে ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় গবেষণা, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিশ্বায়নের প্রভাবে শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন ধারণা বিনিময়, পেশাগত যোগাযোগ জোরদার এবং ভবিষ্যতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণে এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্মেলনে বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে, ইংরেজি শিক্ষাকে পরীক্ষাকেন্দ্রিক ধারা থেকে বের করে বাস্তব জীবন ও পেশাগত প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা সময়ের দাবি। প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যবহারিক অনুশীলন এবং বিভিন্ন শিক্ষাক্ষেত্রের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও সম্প্রসারিত হতে পারে।


