শিশু নিখোঁজ হলে বা হারিয়ে গেলে কী করা উচিত—এই বিষয়টি বাংলাদেশে সম্প্রতি আবারও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে কুমিল্লায় ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়া এবং পরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অপ্রতিমের ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানে কাজ করা প্ল্যাটফর্ম মুন অ্যালার্টের তথ্য অনুযায়ী, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম তিন ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন টাইম’ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ সময় দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশকে জানানো এবং শিশুটির সন্ধানে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
শিশু নিখোঁজ হলে প্রথমেই যা করবেন
শিশু হারিয়ে গেলে কোনোভাবেই সময় নষ্ট না করে দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে। স্থানীয় থানায় গিয়ে শিশুর বিস্তারিত তথ্য দিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পাশাপাশি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা যেতে পারে।
এর পাশাপাশি নিখোঁজ শিশুদের জন্য পুলিশের সিআইডি ও অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশের উদ্যোগে চালু করা ‘মুন অ্যালার্ট’-এর টোল-ফ্রি হটলাইন ১৩২১৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়। মুন অ্যালার্টের ওয়েবসাইটেও নিখোঁজ শিশুর তথ্য জানানো যায়।
শিশুটির নাম, বয়স, ছবি, সর্বশেষ পরা পোশাক, শারীরিক গঠন, বিশেষ কোনো চিহ্ন, সর্বশেষ কোথায় ও কখন দেখা গেছে এবং সঙ্গে কী ছিল—এসব তথ্য দ্রুত পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের দিতে হবে।
আশপাশে দ্রুত খোঁজ করুন
শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরপরই তার আশপাশের এলাকায় খোঁজ চালানো জরুরি। বিশেষ করে শিশুটি নিয়মিত যেসব জায়গায় যায়, সেগুলোতে দ্রুত খোঁজ নিতে হবে।
স্কুলপড়ুয়া শিশু হলে তার বন্ধু বা সহপাঠীর বাসায় গেছে কি না, তা খোঁজ নেওয়া যেতে পারে। ছোট শিশুর ক্ষেত্রে বাড়ির আশপাশের ডোবা, নালা, নির্মাণাধীন ভবন, মাঠ, পরিত্যক্ত জায়গা কিংবা অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে খোঁজ চালাতে হবে।
শিশুটি পরিচিত বা পছন্দের কোনো ব্যক্তির কাছে যেতে পারে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
হাসপাতাল ও পরিবহনকেন্দ্রেও খোঁজ নিন
শিশুটি কোথায় যেতে পারে—এমন সম্ভাবনা ধরে কাছাকাছি হাসপাতাল, ক্লিনিক, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে। শিশুটির নিয়মিত যাতায়াতের স্থানগুলোতেও ভালোভাবে অনুসন্ধান করতে হবে।
কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি থাকলে বা পরিবারের কারও সঙ্গে পূর্বশত্রুতা, হুমকি কিংবা বিরোধ থাকলে সেটিও দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে।
কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় খেয়াল করবেন
কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে অভিমান, পারিবারিক কলহ, পড়াশোনার চাপ, বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাব কিংবা অন্য কোনো কারণে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই নিখোঁজ হওয়ার আগে শিশুটির আচরণে কোনো পরিবর্তন হয়েছিল কি না, কারও সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না বা কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল কি না—এসব তথ্যও পরিবারের সদস্যদের পুলিশের কাছে জানানো উচিত।
শিশুর তথ্য ছড়িয়ে দিন
নিখোঁজ শিশুর সাম্প্রতিক ছবি ও প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত স্থানীয়ভাবে প্রচার করা যেতে পারে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য প্রকাশের সময় শিশুর ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্যের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।
মুন অ্যালার্টের মাধ্যমে নিখোঁজ শিশুর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। সেবাটির মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যম, সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে সতর্কবার্তা প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শিশুকে আগেই সচেতন করুন
শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকি কমাতে বয়স অনুযায়ী তাকে সচেতন করে তোলা জরুরি। নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম এবং অন্তত একটি মোবাইল নম্বর মনে রাখার অভ্যাস করানো যেতে পারে। অপরিচিত কারও সঙ্গে কোথাও না যাওয়ার বিষয়েও শিশুকে বোঝাতে হবে।
একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কোথায় সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর ‘কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি’—এমন সিদ্ধান্ত না নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। মুন অ্যালার্টের ক্ষেত্রেও প্রথম তিন ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন টাইম’ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই পুলিশ, ৯৯৯ এবং মুন অ্যালার্টের মতো সরকারি ও সমন্বিত ব্যবস্থায় দ্রুত তথ্য দেওয়া শিশুটিকে খুঁজে পাওয়ার প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
