চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগের ১৬৬ দিন পর নতুন নেতৃত্ব পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সোমবার (১৮ আগস্ট) রাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিন সদস্যের নতুন কমিশন নিয়োগের কথা জানায়।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. আসাদুজ্জামানকে দুদকের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক সচিব ড. জাহাঙ্গীর আলম খান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া।
দুদক প্রতিষ্ঠার পর এত দীর্ঘ সময় কমিশনবিহীন থাকার ঘটনা আগে ঘটেনি। কমিশন না থাকায় নতুন অভিযোগ অনুসন্ধানের অনুমোদন, মামলা দায়ের, তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্র অনুমোদনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কার্যক্রম কার্যত থেমে ছিল। একই কারণে সম্পদ জব্দ কিংবা বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ায় দীর্ঘদিনের এই স্থবিরতা কাটবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগদান করেছেন। বুধবার সকালে তারা দুদকের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেবেন।
এর আগে দুদকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলী আকবার আজিজী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদ ৩ মার্চ পদত্যাগ করেন।
চেয়ারম্যান মো. আসাদুজ্জামানের কর্মজীবন
নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. আসাদুজ্জামান নওগাঁর সাপাহার উপজেলার খঞ্জনপুর তালকুড়া গ্রামে ১৯৫৯ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
১৯৮৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি। পরে ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক এবং ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান।
বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিতে যুক্ত ছিলেন। ২০১২ সালে হাইকোর্টে জামিন ও আপিল আবেদনের শুনানির দায়িত্বও পালন করেন। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মামলায় তার দেওয়া আদেশ আলোচনায় আসে।
২০২৫ সালের ২৫ মার্চ তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। সংবিধান অনুযায়ী ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়ায় চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি হিসেবে অবসর নেন তিনি।
ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার পরিচয়
দুদকের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া বিসিএস ট্যাক্স ক্যাডারের নবম ব্যাচের কর্মকর্তা। দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে ২০২২ সালে চলতি দায়িত্বে কর কমিশনার হিসেবে অবসরে যান তিনি। পরে ২০২৫ সালের ৪ মে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। শিক্ষাজীবনে তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায় প্রশাসনে পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন।
তার কর্মজীবনের শুরু ব্যাংকিং খাতে। ১৯৮৭ সালে আইসিবির সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দেওয়ার পর ১৯৮৮ সালে এবি ব্যাংকে প্রভিশনারি অফিসার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে শিক্ষকতা করেন। এরপর ১৯৯১ সালে বিসিএস ট্যাক্স ক্যাডারে যোগ দেন।
কর আইন, করনীতি, অর্থপাচার প্রতিরোধ, আর্থিক প্রতিবেদন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। এনবিআরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন সময়ে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে এনবিআরের সদস্য করা হয় এবং ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি অ্যাডজাংক্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ড. জাহাঙ্গীর আলম খানের কর্মজীবন
নতুন কমিশনের আরেক সদস্য ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব। তিনি বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সপ্তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি ওএসডি হিসেবে ছিলেন।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বঞ্চিত কর্মকর্তাদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির উদ্যোগ নেয়। এর আওতায় ড. জাহাঙ্গীর আলম খানও সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পান।
মানিকগঞ্জে জন্ম নেওয়া জাহাঙ্গীর আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে বিদেশ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর তিনি বেসরকারি আশা ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
দীর্ঘ বিরতির পর নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগের মধ্য দিয়ে দুদক আবার পূর্ণাঙ্গ কমিশন পেল। সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর আটকে থাকা অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলাসহ দুর্নীতি দমন সংস্থাটির নিয়মিত কার্যক্রমে আবার গতি ফিরবে।
