২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলেও আগস্টের শুরুতে এসে সেটি দ্রুত সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। মাত্র ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায় এবং ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়।
২ আগস্ট: আন্দোলনে নতুন গতি
২ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে দেশজুড়ে গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের খবর আসে।
সেদিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। আন্দোলনের সমন্বয়কেরা অভিযোগ করেন, তাদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও ধারণে চাপ দেওয়া হয়েছিল।

একই দিন ৩ আগস্ট বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পাশাপাশি রাজধানীতে শিক্ষক, অভিভাবক, সংস্কৃতিকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ‘দ্রোহ যাত্রা’ কর্মসূচি পালন করেন।
এদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেটে ফেসবুক ও টেলিগ্রাম ব্যবহার সীমিত করা হয়। রাতে গণভবনে ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা।

৩ আগস্ট: এক দফা দাবির ঘোষণা
৩ আগস্ট রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে ‘এক দফা’ কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একই সঙ্গে জাতীয় সরকার গঠনের দাবিও জানানো হয়।
আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে। অপরদিকে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণভবনের দরজা খোলা রয়েছে।
সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, চলমান পরিস্থিতিতে সংলাপে বসার কোনো সুযোগ নেই।
একই দিনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন। আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ২২ জন সিনেটর ও কংগ্রেস সদস্য মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে আইএসপিআরের বিবৃতিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব সময় জনগণের পাশে থাকবে।
৪ আগস্ট: অসহযোগ আন্দোলন ও সহিংসতা
৪ আগস্ট শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সরকারি নির্দেশে মোবাইলের ফোর-জি ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এদিন সারা দেশে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর আসে। সিরাজগঞ্জে নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ সদস্যও ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়।
সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়াসহ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সশস্ত্র বাহিনীকে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি না করার আহ্বান জানান।
এদিকে সরকার সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে সারাদেশে কারফিউ জারির ঘোষণা দেয়। শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের একটি অংশকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
একই দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয় এবং দেশব্যাপী সংগ্রাম কমিটি গঠনের আহ্বান জানায়।
৫ আগস্ট: ক্ষমতার পরিবর্তন
৫ আগস্ট সকাল থেকেই কারফিউ উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ ঢাকার দিকে আসতে শুরু করেন। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জনসমাগম বাড়তে থাকে। একই সময়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যেই সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় মোতায়েন হয়। তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের খবরও আসে।
একপর্যায়ে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেছেন। পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানায়, তিনি সামরিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন।
দুপুরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এর পরপরই রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আন্দোলনকারীদের প্রবেশ, বিভিন্ন সরকারি ও রাজনৈতিক স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একই রাতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে সংসদ ভেঙে দিয়ে দ্রুত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।
অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা জানান, তাদের প্রস্তাবিত কাঠামোর ভিত্তিতেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা উচিত।
পরদিন ৬ আগস্ট ভোর থেকে দীর্ঘ ১৭ দিন পর সারাদেশে কারফিউ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর পর কোটা সংস্কার আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। জুলাইয়ের শেষ দিকে তা দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান রয়েছে। সরকারি হিসাবে আন্দোলনকালীন সহিংসতায় ৮০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্টের ঘটনায় প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
