উন্নত জীবনের আশায় লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন হাজারো বাংলাদেশি। তবে এই অনিয়মিত অভিবাসনের পথে প্রতিনিয়ত ঘটছে মৃত্যু, নির্যাতন, জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, মানব পাচার এবং বিভিন্ন দেশে আটকের মতো ভয়াবহ ঘটনা। এতসব ঝুঁকির পরও ইউরোপমুখী বাংলাদেশিদের এই প্রবণতা কমছে না বলে সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ।
ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। এ সময় অনেকে সাগরপথে প্রাণ হারিয়েছেন, আবার অনেকেই লিবিয়ায় আটকা পড়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। গত ছয় বছরে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে লিবিয়া থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ফ্রন্টেক্স জানায়, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে গত কয়েক বছরের মতো এবারও বাংলাদেশিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে ২০২৬ সালে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

চলতি বছরের মার্চে লিবিয়ার তোবরুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া একটি নৌযান দিক হারিয়ে ছয় দিন সাগরে ভাসতে থাকে। খাদ্য ও পানির সংকটে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ১২ জন ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর হয়ে ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইতালিতে পৌঁছেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং গ্রিসে প্রবেশ করেছেন আরও ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি। এদের বেশিরভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানব পাচারকারীরা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন নতুন কৌশলে মানুষকে প্রলুব্ধ করছে। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ইউরোপে পৌঁছানোর গল্প, নৌযাত্রার ছবি এবং যোগাযোগ নম্বর ছড়িয়ে দিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।
শুধু ইউরোপ নয়, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশিদের নিয়ে গিয়ে মানব পাচার, জোরপূর্বক শ্রম, যৌন শোষণ এবং সাইবার প্রতারণার কাজে বাধ্য করার অভিযোগ বাড়ছে। অনেককে বৈধ ভিসায় বিদেশে নেওয়ার পর পাসপোর্ট জব্দ করে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হচ্ছে।
কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকে পড়া বহু বাংলাদেশি সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। তাদের অধিকাংশই জানিয়েছেন, প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে এবং অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
অন্যদিকে, মানব পাচারের শিকার হয়ে দেশে ফেরা অনেক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, মুক্তিপণের জন্য দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পাশাপাশি পরিবারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। কেউ কেউ স্থায়ীভাবে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেকারত্ব, বিদেশে উচ্চ আয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং দালালচক্রের সক্রিয়তার কারণে মানব পাচার বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার, কঠোর আইন প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচারসংক্রান্ত হাজার হাজার মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে। আইন থাকলেও অধিকাংশ মামলার নিষ্পত্তি বিলম্বিত হওয়ায় পাচারকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতি বছর ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস পালিত হয়। মানব পাচার সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এই অপরাধ দমনে বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যেই দিবসটি পালন করা হয়। চলতি বছরের প্রতিপাদ্য “প্রতারণার ফাঁদে বন্দি”।
