চট্টগ্রাম: একসময় ক্রিকেট মাঠে নিজের প্রতিভার জন্য পরিচিত ছিলেন ডেভিড ইমন। বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের নেট বোলার হওয়ার সুযোগও পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদের জীবন পরে মোড় নেয় অপরাধ জগতে। বর্তমানে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম আলোচিত নাম হিসেবে পরিচিত এই ডেভিড ইমনকে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বুধবার (২৯ জুলাই) যশোর শহরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে চট্টগ্রাম নগরী থেকে রাউজান পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন তিনি।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক জানান, কয়েক দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করেন ইমন। গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে তিনি পুনরায় ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।

ক্রিকেটেই ছিল স্বপ্ন
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা ডেভিড ইমন দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বড়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল। নিয়মিত ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে অনুশীলন করতেন। পরে নগরীর অক্সিজেন এলাকায় আত্মীয়ের বাসায় থেকে চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন এবং কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে অনুশীলন চালিয়ে যান।
চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমির সাবেক কোচ আমিনুল হক জানান, ইমন ছিলেন প্রতিভাবান বাঁহাতি লেগ স্পিনার (চায়নাম্যান)। বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও দক্ষ ছিলেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দলের ক্রিকেটাররা চট্টগ্রামে এলে নেট অনুশীলনে প্রায়ই তিনি বল করতেন। তবে ২০২০ সালের পর হঠাৎ করেই ক্রিকেট থেকে হারিয়ে যান।
কীভাবে জড়িয়ে পড়েন অপরাধ জগতে
পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর কলেজে ভর্তি হলেও এইচএসসি পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি তার। ২০২০ সালের পর তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরে কিছু রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
২০২২ সালে ওমানে গেলেও প্রায় এক বছর পর দেশে ফিরে আসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে চলে যান এবং চট্টগ্রামের বায়েজীদ বোস্তামী এলাকায় অবস্থানকালে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, পরবর্তীতে বিদেশে অবস্থানরত বড় সাজ্জাদের নির্দেশনায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন ইমন। ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
একাধিক মামলার আসামি
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাকলিয়ার জোড়া হত্যা, পতেঙ্গা এলাকায় সন্ত্রাসী হত্যাকাণ্ড, হাটহাজারীর জোড়া খুন এবং চান্দগাঁওয়ের একটি হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করতেন তিনি। চাঁদা না দিলে হত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চলতি বছরের জুলাই মাসে নগরীর একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং মাসিক ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
‘বড়লোক হওয়ার জন্য এই পথে’
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার কারণ জানতে চাইলে পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে ইমন বলেন, ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল বড় ক্রিকেটার অথবা বড়লোক হওয়ার। সেই লক্ষ্যেই তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন বলে দাবি করেন।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ফোনে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ইমন অত্যন্ত কৌশলী ছিলেন। তার হুমকিতে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন। পাশাপাশি অস্ত্র ব্যবহারে তার দক্ষতাও ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
