রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। শনিবারের (১০ অক্টোবর) এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি অসম্মান এবং প্রতিবাদের ধরন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে প্রতিকৃতি থেকে কালি মুছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে প্রশংসা পাচ্ছেন এক রিকশাচালক।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লাগাচ্ছেন। এ সময় সেখানে দায়িত্ব পালনরত এক পুলিশ সদস্য তাঁকে বাধা দেন। পরে খবর পেয়ে অন্য পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে একজন নারী ও তিনজন পুরুষসহ চারজনকে আটক করেন।

আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম আয়াস রয়েছেন। অন্যরা হলেন মো. সাকিবুল হাসান (১৯), মো. সুজন মিয়া (১৮) ও মারজিয়া খন্দকার রিমি (২৭)।
এ ঘটনায় করা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। রোববার (১১ অক্টোবর) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলায় রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ, ধর্মীয় সম্প্রীতিতে আঘাতের চেষ্টা এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগ আনা হয়েছে। শাহবাগ থানার পুলিশ বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ১২০খ, ১৫৩ক ও ২৯৫ক ধারায় মামলাটি করেছে।

ঘটনার সময় ধারণ করা ভিডিওতে মারজিয়া খন্দকার রিমিকে ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানাতে সেখানে যাওয়ার কথা বলতে শোনা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। এসব বক্তব্য তাঁর নিজস্ব দাবি; এর সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দা ও সমালোচনা
ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক বা আদর্শিক অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার সবার থাকলেও সেই প্রতিবাদের নামে দেশের বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের প্রতিকৃতিতে আঘাত করা গ্রহণযোগ্য নয়।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিকে লক্ষ্যবস্তু করার যৌক্তিকতা কী। তাঁদের বক্তব্য, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীত বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ফলে রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. আব্দুন নূর তুষার ফেসবুকে এ ঘটনার সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি নিয়ে এমন কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানো হয়।
অ্যাক্টিভিস্ট ফাহাম আবদুস সালামও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, লেখক ইমতিয়াজ মাহমুদ রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যিক পরিচয় এবং এই ভূখণ্ডের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
কালি মুছে আলোচনায় রিকশাচালক
রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দা-সমালোচনা চলছে, তখন সেই কালি মুছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া এক রিকশাচালকও আলোচনায় এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে তাঁর উদ্যোগের প্রশংসা করছেন।
সাধারণ শ্রমজীবী হয়েও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর এ উদ্যোগ অনেকের নজর কেড়েছে। অনেকে এটিকে দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।

ফুটপাত সংস্কার থেকে দেয়ালে বরেণ্য ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি
শিল্পকলা একাডেমির সামনের সড়কের ফুটপাত একসময় হকার ও পুরোনো আসবাবপত্রের ভ্রাম্যমাণ দোকানের দখলে ছিল। এতে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা তৈরি হতো। এ পরিস্থিতিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সেগুনবাগিচা ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালায়।
ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সেখানে সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে দেয়ালে আঁকা হয় দেশের বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি।
দেয়ালচিত্রে স্থান পেয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, বাউল সাধক ফকির লালন শাহ, চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, শিক্ষাবিদ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম, অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি এবং সংগীতশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরী।
গত ৫ অক্টোবর এসব প্রতিকৃতি আঁকার কাজের উদ্বোধন করেন ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম। নগরীর সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে দেশের সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা ও চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের পরিচিত করে তোলাও এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে নতুন আলোচনা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধে তাঁর অবদান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। একইভাবে কাজী নজরুল ইসলাম, লালন শাহ, জয়নুল আবেদিন ও এস এম সুলতানসহ অন্য মনীষীদের সৃষ্টিকর্ম বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সেগুনবাগিচার দেয়ালে আঁকা প্রতিকৃতিগুলো তাই শুধু নগরসজ্জার উপকরণ নয়; এগুলো দেশের সাহিত্য, শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও প্রতিনিধিত্ব করে। রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে—রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা প্রতিবেশী দেশের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও প্রতিবাদের ভাষা ও পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে সমাজে আলোচনা জরুরি।


