ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা আনতে নতুন নীতিমালা জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, একই কর্মস্থলে টানা তিন বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করলে সাধারণভাবে কর্মচারীরা বদলিযোগ্য হবেন।
তবে জনস্বার্থ বা প্রশাসনিক প্রয়োজনের কারণে বদলির ক্ষেত্রে এই মেয়াদসংক্রান্ত শর্ত প্রযোজ্য হবে না।
গত ৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অগ্নি-১ শাখা থেকে ‘অগ্নিনির্বাপণ ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা অধিদপ্তরের কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেছেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। জারির দিন থেকেই নীতিমালাটি কার্যকর করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালার মাধ্যমে ২০২৩ সালের বদলি ও পদায়ন নীতিমালা (সংশোধিত ২০২৪) বাতিল করা হয়েছে। অধিদপ্তরের স্থায়ী ও অস্থায়ী পদে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি অন্যত্র প্রেষণ বা লিয়েনে থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রেও নতুন নীতিমালা প্রযোজ্য হবে। তবে উন্নয়ন প্রকল্পে চুক্তিভিত্তিক, আউটসোর্সিং বা দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কর্মীদের ক্ষেত্রে এর বিধান প্রযোজ্য নয়।
গ্রেড অনুযায়ী বদলি-পদায়নের দায়িত্ব
নীতিমালা অনুযায়ী, পঞ্চম গ্রেড ও তার ওপরে থাকা কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নের বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নের দায়িত্ব থাকবে অধিদপ্তরের ওপর।
বদলির আবেদন বিবেচনার সময় জ্যেষ্ঠতা, শৃঙ্খলা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
১২তম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মচারীদের নিজ জেলায় বদলি বা পদায়ন করা যাবে না। তবে ১৩তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের নিজ উপজেলা ছাড়া নিজ জেলার মধ্যে স্থায়ী ঠিকানার কাছাকাছি কোনো দপ্তর বা স্টেশনে পদায়ন করা যেতে পারে।
নিজ জেলায় পদ শূন্য না থাকলে নিজ বিভাগের অন্য জেলায় এবং সেখানেও সুযোগ না থাকলে পার্শ্ববর্তী বিভাগের স্থায়ী ঠিকানার কাছাকাছি দপ্তর বা স্টেশনে বদলি করা যাবে।
দুর্গম এলাকায় চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান
সাধারণভাবে একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করলে কর্মচারী বদলিযোগ্য হবেন। তবে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এবং হাওর, দ্বীপ ও চর উপজেলায় স্থায়ী বাসিন্দা নন—এমন কর্মচারীদের ক্ষেত্রে দুই বছরের বেশি কর্মকাল পূর্ণ হলে বদলি বা পদায়নের বিধান রাখা হয়েছে।
তবে প্রশাসনিক কারণে বদলি হলে এসব মেয়াদসংক্রান্ত বিধান প্রযোজ্য হবে না।
স্টেশন অফিসার বা সমমানের পদ থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মচারীদের নিজ জেলায় বদলি বা পদায়ন করা যাবে না। তবে মহানগর বা সিটি করপোরেশন এলাকায় পদায়নের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না। এ ধরনের বদলি বা পদায়ন একজন কর্মচারীর পুরো চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার করা যাবে।
জনস্বার্থে যেকোনো সময় বদলি
জনস্বার্থে প্রয়োজন হলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় কর্মচারীকে যেকোনো দপ্তর বা স্টেশনে বদলি বা পদায়ন করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ বদলির মেয়াদসংক্রান্ত শর্ত কার্যকর হবে না।
তবে প্রশাসনিক কারণে বদলি করা হলে তিন বছরের মধ্যে পুনরায় বদলি বা পারস্পরিক বদলির জন্য আবেদন করা যাবে না।
স্বামী-স্ত্রী ও অসুস্থতার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার
নিজস্ব স্বার্থে বদলির ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু সুযোগ রাখা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী হলে তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই কর্মস্থল অথবা কাছাকাছি জেলা বা উপজেলায় পদায়নের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
এ ছাড়া কর্মচারী নিজে অথবা তাঁর বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী কিংবা সন্তানের দুরারোগ্য ব্যাধি থাকলে চিকিৎসার সুবিধার্থে উপযুক্ত স্থানে বদলি বা পদায়নের আবেদন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে।
অবসরের আগে বদলিতে বিশেষ সুবিধা
অবসরোত্তর ছুটি শুরু হতে ১৩ মাসের কম সময় বাকি থাকলে জনস্বার্থ বা প্রশাসনিক প্রয়োজন ছাড়া কোনো কর্মচারীকে তাঁর আবেদন ব্যতীত অন্য কর্মস্থলে বদলি করা যাবে না। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী দায়িত্ব পালনে অনুপযুক্ত বা অক্ষম হিসেবে বিবেচিত হলে এ সুবিধা প্রযোজ্য হবে না।
পেনশন-সংক্রান্ত সুবিধা নিশ্চিত করতে অবসরোত্তর ছুটি শুরুর ১৩ মাস আগে নিজ জেলা বা আবেদিত জেলায় বদলির সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এতে জনস্বার্থ ব্যাহত হওয়ার বা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরির আশঙ্কা থাকলে এই সুবিধা দেওয়া হবে না।
মানবিক বা অন্য কোনো কারণে বদলি বা পদায়নের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য মহাপরিচালকের কাছে চাকরিজীবনে অবসর ছাড়া সর্বোচ্চ দুইবার আবেদন করা যাবে।
পারস্পরিক বদলির সুযোগ
একই পদে কর্মরত দুজন কর্মচারীর চাকরির রেকর্ড সন্তোষজনক হলে এবং উভয়ের সম্মতি থাকলে পারস্পরিক বদলির সুযোগ থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রেও সাধারণ বদলি ও পদায়নের শর্তগুলো অনুসরণ করতে হবে।
নবনিযুক্ত কর্মচারীদের মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর জনবলস্বল্পতাপূর্ণ বিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
পদোন্নতি পাওয়া কর্মচারীদের পদায়নের ক্ষেত্রে সাধারণত কর্মস্থল পরিবর্তন করতে হবে। একইভাবে লিয়েন, প্রেষণ বা শিক্ষাছুটি শেষে অধিদপ্তরে যোগ দিলে আগের কর্মস্থল ছাড়া অন্যত্র পদায়ন করতে হবে। শিক্ষাছুটি শেষে ফেরা কর্মচারীদের অর্জিত জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এক বছর পর্যন্ত সংযুক্তির সুযোগ
অধিদপ্তরের সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা, বিশেষায়িত ইউনিট পরিচালনা এবং অপারেশনাল ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে কোনো কর্মচারীকে এক বছরের জন্য সংযুক্ত করা যাবে।
জনস্বার্থে প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষ এই মেয়াদ আরও সর্বোচ্চ এক বছর বাড়াতে পারবে। তবে প্রশাসনিক শৃঙ্খলাজনিত কারণে বদলি হওয়া কোনো কর্মচারীকে তিন বছরের মধ্যে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সংযুক্ত করা যাবে না।
নীতিমালা অনুযায়ী, বদলি ও পদায়নের প্রস্তাব অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ)-এর মাধ্যমে মহাপরিচালকের কাছে উপস্থাপন করতে হবে।
নীতিমালা বাস্তবায়নে কোনো জটিলতা দেখা দিলে বা কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অফিস আদেশের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।


