ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেওয়া কিশোরগঞ্জ-২ আসনের দুবারের সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া ও ‘মার’ দেওয়ার হুমকি এবং নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগে গতকাল শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তাকে গ্রেপ্তার করে।
এর আগে এদিন সকালে আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়। এদিকে, তার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনে দুবারের সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। এর আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জুনে কটিয়াদী আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে তিনি জয়লাভ করেছিলেন। একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন আখতারুজ্জামান। সর্বশেষ ২০২২ সালে দলীয় শৃঙ্খলাপরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার অভিযোগে বিএনপি থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার সকালে মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে আসা ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্ব হয়। ওই ফ্লাইটে ছিলেন আখতারুজ্জামান। ঢাকার বিমানবন্দরে নেমে তিনি ওই ঘটনা নিয়ে বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘বাজে’ আচরণ শুরু করেন। তিনি বিমানমন্ত্রীর নাম ধরেও আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তার উচ্চবাচ্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়, জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে উদ্দেশ করে বলছেন, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিব, ঘাড় ধরে বের করে দিব। আপনারা কাজ করেন না, কিছু করেন না, তদবির করে পোস্ট নেন। মার খাইতে চান?’ তবে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে শান্তভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিমানবন্দরের মতো এলাকায় দায়িত্বশীল ব্যক্তির এমন অশোভন আচরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এর পরই গতকাল শুক্রবার বিমানবন্দর থানায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিরাপত্তা কর্মকর্তা শাহরিয়ার আলম সজীব মামলা করেন। মামলায় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও হুমকি প্রদানের অভিযোগ আনা হয়েছে।
গতকাল বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিমানবন্দর থানার মামলার আসামি আখতারুজ্জামানকে তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
যে অভিযোগে মামলা
ওই মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে বিমান বাংলাদেশের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে জামায়াতের ৩৪ জন প্রতিনিধি সপরিবারে মদিনা থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছান। সে সময় বিমানবন্দরে আগমনী যাত্রীর বাড়তি চাপ থাকায় ট্রলি সংগ্রহের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। কয়েকজন প্রটোকল সহকারী লাইনের নিয়ম ভেঙে ট্রলি সংগ্রহের চেষ্টা করেন।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি পরে লাগেজ আসতে বিলম্ব হওয়া এবং জমজমের পানি না আসায় উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং অশোভন আচরণ করেন। এর মধ্যে বেলা পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা-৫ আসনের এমপি মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ঘটনাস্থলে ডেকে পাঠান।
এজাহারে বলা হয়, সঙ্গে সঙ্গে নির্বাহী পরিচালক সেখানে এসে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। ওই সময় তার দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে আসা অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান অত্যন্ত রূঢ়, অশালীন ও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন।
তখন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক অত্যন্ত শান্তভাবে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও ট্রলি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করলেও আখতারুজ্জামান আরও উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’, ‘গেট আউট ফ্রম হিয়ার’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিব’, ‘কাজ জানেন না, তদবির করে পোস্টিং-এ আসবেন’, ‘মার খাইতে চান?’।
আখতারুজ্জামানের আচরণ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও মারমুখী ছিল উল্লেখ করে মামলায় বলা হয়, পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় ঢাকা-৫ আসনের এমপি কামাল হোসেন নির্বাহী পরিচালককে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যান।
পরে আখতারুজ্জামান ফের উত্তেজিত হয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে হুমকি দেন, ‘আপনাদের সবাইকে বিমানবন্দরে বেঁধে পিটানো এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া দরকার, যাতে তারেক রহমান এটি দেখেন, তখন আপনারা সোজা হবেন। আপনাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিব।’
ওই সময় তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সম্পর্কে অত্যন্ত অশালীন ও অবমাননাকর মন্তব্য করেন। তখন আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা কয়েকজন প্রটোকল সহকারী ঘটনার ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করার হুমকি দেন বলেও এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার বিবরণে আরও বলা হয়েছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় তখন দায়িত্বরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বিমানবন্দরের কেপিআই এলাকায় ভিডিও ধারণ না করতে সংশ্লিষ্টদের নিষেধ করেন। তখন আখতারুজ্জামান অতর্কিতে ওয়ারেন্ট অফিসার কামাল উদ্দিনের কাছে গিয়ে তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে আঘাত করেন।
পরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে তার সঙ্গেও অশোভন ও মারমুখী আচরণ করেন আখতারুজ্জামান। ওই সময় তিনি সাধারণ যাত্রীদের জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলেন।
জমজমের পানি দিতে দেরি, দুই কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত
এদিকে, বৃহস্পতিবার ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি দিতে দেরি হওয়ার ঘটনায় ব্যাগেজ ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম প্রধান ও ফ্লাইট সুপারভাইজার সাদ্দাম হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তাদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
ওই দিনের ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে অনাকাঙ্ক্ষিত সাময়িক বিলম্বের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। কনটেইনার অফলোডিং ও পরিচালনগত গাফিলতির কারণে ব্যাগেজ বেল্টে সময়মতো পানি পৌঁছাতে বিলম্ব ঘটেছিল।
তবে ঘটনাটি নজরে আসামাত্র ওমরাহ হাজিদের সাময়িক দুর্ভোগ নিরসনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ নিজস্ব সংরক্ষিত স্টক থেকে দ্রুত জমজমের পানি বিতরণের ব্যবস্থা করে এবং পরে অপর কনটেইনারটি দ্রুত শনাক্ত করে সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।
আখতারুজ্জামানের মুক্তি দাবি জামায়াতের
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে দলটি।
গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব দাবি জানান।


