চলতি বছরের মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে সারা দেশে ৯৩৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, এই সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ৩০০টির বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন খুন হয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাতে বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি রংপুরে একটি বাসায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে শুধু ওই একটি ঘটনাই নয়, গত কয়েক মাস ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, চুরি ও ডাকাতির ঘটনা আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও খুন বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০টির মতো খুনের ঘটনা ঘটছে। গড়ে প্রতিদিন ১০টি করে খুন যেন আমাদের ভাগ্যে লেখা রয়েছে।
সাত মাসে খুনের মামলা ২ হাজার ৭৬টি
পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে খুন বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোট ২ হাজার ৭৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি, মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি, মে মাসে ৩১০টি, জুনে ৩২৬টি এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি মামলা হয়েছে।
মাস শেষ না হওয়ায় আগস্ট মাসের প্রতিবেদন এখনো পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে যুক্ত হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশের আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছেন অন্তত ৭৭ জন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক সংঘাত, মাদক এবং পারিবারিক কলহ বা বিরোধের কারণে দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেশি ঘটছে।
অস্ত্রের বিস্তার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
অপরাধ বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বৈধ ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতাসহ নানা কারণে খুন ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, এখন অনেকের হাতে অস্ত্র চলে গেছে। অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালানও বাড়ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিরোধ কিংবা ক্ষমতার আধিপত্যের কারণে খুন ও সহিংসতা বাড়ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে সারা দেশে খুনের ঘটনায় ১ হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৮০টি। অর্থাৎ, খুনের মামলা বেড়েছে ৯টি।
অন্যদিকে, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় গত ছয় মাসে ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে মামলা হয়েছিল ১০ হাজার ৯০টি। এই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি।
অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, দস্যুতা, ডাকাতি কিংবা চুরির ঘটনা কমলেও খুনের ঘটনা হয়তো খুব একটা কমেনি। স্থানীয় বিরোধ ও অস্থিরতা অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। তবে পুলিশ তাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক কোন্দলেও বাড়ছে সহিংসতা
গত রোববার (২৩ আগস্ট) রাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা আল আমিনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।
গত ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি, জামায়াত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এনসিপির মধ্যে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২ হাজার ৯৭৪ জন আহত এবং অন্তত ৭৭ জন নিহত হয়েছেন।
এর মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘাতে চারজন, জামায়াত-বিএনপির সংঘাতে নয়জন এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৬ জন নিহত হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক কারণও অন্যতম। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪০ জন দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছেন।
মানবাধিকার কর্মী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খান বলেন, নির্বাচিত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার পরিমাণ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। পদ-পদবি নিয়ে সংঘর্ষ হচ্ছে। এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।
তবে পুলিশ বলছে, রাজনৈতিক কোন্দল আগে যেমন ছিল, এখনো রয়েছে। রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতা চাইলেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা আগেও ঘটেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশের ওপর কোনো ধরনের চাপ নেই। পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে।
কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না অপরাধ?
চলতি বছরে ঢাকার মিরপুরে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী রামিসার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন। ওই ঘটনায় জড়িতদের আটক করে পুলিশ। ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় ঢাকার নিম্ন আদালত মামলাটির রায়ও দেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রামিসার ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। তবে সব ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো আগের মতো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ সুযোগে খুন, সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধ বেড়েছে। একই সঙ্গে অপরাধ দমনে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অধ্যাপক উমর ফারুক বলেন, খুন ও সহিংসতার মতো অপরাধ যেভাবে বাড়ছে, তা দমনে সে অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে সরকারের বিশেষায়িত অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর পুলিশের অনেক সদস্য ডিমোরালাইজড হয়ে পড়েছেন এবং অনেকে ভীতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
মব সহিংসতাও উদ্বেগের কারণ
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দেশে মব সহিংসতার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় মানবাধিকারকর্মীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় সর্বোচ্চ ৫০ জন এবং চট্টগ্রামে ৩১ জন নিহত হয়েছেন।
মানবাধিকারকর্মী এলিনা খান বলেন, এটি একটি নির্বাচিত সরকার। মানুষ নিরাপত্তা চায়। যে কোনো মূল্যে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
তবে অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, আগে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল, তার তুলনায় বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
